সাধক
বাংলার শাক্ত ধারার সাধকেরা — তাঁদের জীবনকথা, আর তাঁদের নিয়ে যে কাহিনী মুখে মুখে চলে আসছে।
রামপ্রসাদ সেন
আনুমানিক ১৭২০ – ১৭৮১ · কুমারহট্ট (হালিশহর), উত্তর ২৪ পরগনা
বাংলা শাক্তপদাবলীর জনক — যিনি মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করতে পারতেন
জীবন
রামপ্রসাদের জন্ম হালিশহরের এক বৈদ্য পরিবারে। বাবা রামরাম সেন ছিলেন আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক। ছেলেকে তিনি সংস্কৃত, ফারসি, হিন্দি শেখালেন — উদ্দেশ্য, ছেলে কাজকর্ম করে সংসার চালাবে।
কিন্তু ছেলের মন পড়াশোনায় নয়। কিশোর বয়স থেকেই তিনি সাধুসঙ্গ করতেন, গান বাঁধতেন। বিয়ে হল সর্বাণীর সঙ্গে, সংসার বাড়ল, আর টাকার টান বাড়ল। শেষে কলকাতায় এক জমিদারি সেরেস্তায় কেরানির কাজ জুটল — মাসে তিরিশ টাকা।
সেই চাকরিই তাঁর জীবন ঘুরিয়ে দিল, তবে যেভাবে কেউ ভাবেনি। হিসেবের খাতায় তিনি হিসেব লিখতেন না, গান লিখে ফেলতেন। একদিন মালিক দুর্গাচরণ মিত্র খাতা দেখতে গিয়ে দেখলেন, পাতায় পাতায় হিসেবের বদলে মায়ের গান।
সচরাচর এর পরিণাম চাকরি যাওয়া। এখানে হল উল্টো। দুর্গাচরণ পড়তে শুরু করে থামতে পারলেন না। তিনি রামপ্রসাদকে ডেকে বললেন, ‘তুমি বাড়ি ফিরে যাও। গান লেখো। মাইনে চলতে থাকবে।’ সেরেস্তা হারাল এক কেরানিকে, বাংলা পেল তার শ্রেষ্ঠ শাক্ত কবিকে।
হালিশহরে ফিরে তিনি গঙ্গার ধারে পঞ্চমুণ্ডীর আসনে সাধনা করতেন, আর গান বাঁধতেন। তাঁর গানকে বলা হয় ‘রামপ্রসাদী’ — এক বিশেষ সুরের ধারা, যা আজও আলাদা করে চেনা যায়।
তাঁর গানের চরিত্র বাংলা ভক্তিসাহিত্যে নতুন। তিনি মাকে স্তব করেন না — কথা বলেন। কখনও অভিমান করেন, কখনও বকেন, কখনও হিসেব চান, কখনও শাসান — ‘তোমাকে আর ডাকব না।’ মাকে তিনি জমিদার বলেন, নিজেকে তবিলদার; মাকে মেয়ে বলেন, নিজেকে বাবা। এ জিনিস তাঁর আগে বাংলায় ছিল না।
নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে তাঁর গান শোনানোর কথা প্রচলিত আছে; কৃষ্ণনগরের মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র তাঁকে ‘কবিরঞ্জন’ উপাধি দেন ও সভাকবি করতে চান — রামপ্রসাদ থেকে যান গ্রামেই।
মৃত্যুও তাঁর গানের মতোই। কথিত আছে, কালীপূজার বিসর্জনের দিন তিনি প্রতিমার সঙ্গে গঙ্গায় নেমেছিলেন, গান গাইতে গাইতে জলে নামলেন, আর ফিরলেন না।
কাহিনী
বেড়া বেঁধে দিলেন কে
বাড়ির বেড়া ভেঙে গেছে। রামপ্রসাদ মেয়েকে ডেকে বললেন, ‘ধর তো, বাঁধি।’ মেয়ে ওপাশ থেকে দড়ি এগিয়ে দিতে লাগল, তিনি এপাশে বাঁধতে লাগলেন। খানিক পরে মায়ের ডাকে মেয়ে ঘরে চলে গেল; রামপ্রসাদ টের পেলেন না।
বাঁধতে বাঁধতে মনে গান এল। তিনি গান ধরলেন, আর গানে ডুবে গিয়ে সব ভুলে গেলেন — কতক্ষণ কাটল, খেয়াল নেই।
গান শেষ হলে দেখেন বেড়া বাঁধা হয়ে গেছে, নিখুঁতভাবে। তিনি বললেন, ‘মা, তুই এতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে ছিলি?’ ঘুরে দেখেন কেউ নেই।
ভিতরে গিয়ে দেখেন, মেয়ে ঘরের কাজে ব্যস্ত — সে অনেক আগেই চলে এসেছে, তারপর আর বেড়ার কাছে যায়নি।
সিরাজের নৌকা
একটা গল্প বহুকাল ধরে চলে আসছে। নৌকাযোগে যাওয়ার পথে নবাব সিরাজউদ্দৌলা নাকি তীরে এক ভিখারির গান শুনে থেমে যান। গান শুনে তিনি লোকটিকে ডেকে পাঠান।
রামপ্রসাদ এলেন। নবাব বললেন, ‘গাও।’ তিনি গাইলেন। নবাব বাংলা বোঝেন কি না সে প্রশ্ন থাক — গান শুনে তাঁর চোখে জল এল।
তিনি রামপ্রসাদকে পুরস্কার দিতে চাইলেন। রামপ্রসাদ নিলেন না। বললেন, ‘আমার জমিদার আলাদা। তাঁর কাছে যা পাই, তার বেশি কিছু নিলে তাঁর অপমান।’
মেয়ে না মা
রামপ্রসাদের গানে একটা জিনিস বারবার ফেরে — মা তাঁর কাছে ঘরের মেয়ে। তিনি লেখেন, মা দুঃখে আছেন, মায়ের গয়না নেই, মায়ের খাওয়া জোটেনি।
এক পণ্ডিত একদিন আপত্তি করলেন — ‘জগজ্জননীকে মেয়ে বলা ধৃষ্টতা।’
রামপ্রসাদ বললেন, ‘আপনি বড় বলে ডাকেন, আপনার হাত কাঁপে। আমি মেয়ে বলে ডাকি, আমার হাত কাঁপে না। যে সম্পর্কে ভয় থাকে, সে সম্পর্কে আদর থাকে না।’
চোরের গান
এক রাতে রামপ্রসাদের ঘরে চোর ঢুকেছে। ঘরে নেওয়ার মতো কিছু নেই — তবু যা আছে, চোর বাঁধতে লাগল।
রামপ্রসাদ জেগে গেলেন। চেঁচালেন না, লোক ডাকলেন না।
তিনি গান ধরলেন।
চোর প্রথমে ভাবল, লোকটা পাগল। তারপর বোঁচকা হাতে দাঁড়িয়ে রইল। গান শেষ হলে সে বোঁচকা নামিয়ে রেখে চলে গেল।
গল্পটা প্রচলিত ধারার; এর কোনও সমসাময়িক নথি নেই। তবু কথাটা টিকে আছে, কারণ এর ভিতরে রামপ্রসাদের স্বভাবটা ধরা পড়ে — বিপদ দেখলে তিনি চেঁচাতেন না, গাইতেন।
কমলাকান্ত ভট্টাচার্য
আনুমানিক ১৭৭২ – ১৮২১ · চান্না গ্রাম, বর্ধমান
রামপ্রসাদের পরে সবচেয়ে বড় শাক্তপদকার — ‘সদানন্দময়ী কালী’ যাঁর
জীবন
কমলাকান্তের জন্ম কালনার কাছে; পরে তিনি বর্ধমানের চান্না গ্রামে বসবাস করেন। সংস্কৃতে তাঁর দখল ছিল গভীর — তন্ত্র, ন্যায়, কাব্য।
বর্ধমানের মহারাজা তেজচন্দ্র তাঁকে সভাপণ্ডিত ও পুত্রের শিক্ষক নিযুক্ত করেন। রাজসভায় থেকেও তিনি সাধক থেকে গেলেন — রাজবাড়ির কালীমন্দিরেই তাঁর সাধনা।
রামপ্রসাদের গানে যেটি আবদার, কমলাকান্তের গানে সেটি তত্ত্ব। তিনি মাকে নিয়ে যত না ঝগড়া করেন, তার চেয়ে বেশি অবাক হন — ‘তুমি আপনি নাচ, আপনি গাও, আপনি দাও মা করতালি।’ নাচিয়ে, গাইয়ে আর দর্শক, তিনজনই এক।
তাঁর রচিত গ্রন্থের মধ্যে ‘সাধকরঞ্জন’ উল্লেখযোগ্য। তবে বাঙালির ঘরে তিনি বেঁচে আছেন গানে — শ্যামাসঙ্গীতের আসরে রামপ্রসাদের পরেই তাঁর নাম।
কাহিনী
মা কি সত্যিই খান
তাঁকে নিয়ে যে গল্পটি সবচেয়ে বেশি শোনা যায় সেটি এই। রাজবাড়ির মন্দিরে কমলাকান্ত পূজা করছেন। মহারাজ তেজচন্দ্র দূর থেকে দেখছেন।
কমলাকান্ত ভোগ নিবেদন করে চুপ করে বসে রইলেন। অনেকক্ষণ। তারপর হঠাৎ কেঁদে উঠলেন।
মহারাজ জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী হল?’ তিনি বললেন, ‘মা আজ খেলেন না। কী দোষ করেছি জানি না।’
মহারাজ ভাবলেন, পাগলামি। কিন্তু প্রচলিত কথা — সেদিনই জানা যায়, ভোগের চালে ভেজাল ছিল, রাজবাড়ির এক কর্মচারী ভালো চাল সরিয়ে নিম্নমানের চাল দিয়েছিল।
করতালি
শিষ্যরা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি গানে লেখেন মা নিজেই নাচেন, নিজেই গান, নিজেই হাততালি দেন। তবে আমরা কী করি?’
কমলাকান্ত বললেন, ‘তোমরা ভাবো তোমরা দেখছ। আসলে তিনি তোমাদের ভিতর থেকে দেখছেন। নাচিয়ে তিনি, দর্শকও তিনি। তোমাদের কাজ একটাই — আসন ছেড়ে উঠে গিয়ে নিজেরা নাচতে শুরু কোরো না।’
শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস
১৮৩৬ – ১৮৮৬ · কামারপুকুর, হুগলি · দক্ষিণেশ্বর
যাঁর কাছে ভবতারিণী মূর্তি ছিলেন না, ঘরের লোক ছিলেন
জীবন
কামারপুকুরের দরিদ্র ব্রাহ্মণ ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়ের ছোট ছেলে গদাধর। ছেলেবেলা থেকেই অদ্ভুত — পাঠশালার হিসেব শিখতে চাইতেন না, বলতেন ‘চাল-কলা-বাঁধা বিদ্যা শিখব না’। কিন্তু যাত্রা, পুরাণ, গান একবার শুনলেই মুখস্থ।
ছ-সাত বছর বয়সে প্রথম ভাবসমাধি। মাঠের পথে হাঁটছেন, আকাশে কালো মেঘ, তার সামনে দিয়ে সাদা বকের সারি উড়ে গেল — সেই দৃশ্য দেখে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন।
বাবার মৃত্যুর পর দাদা রামকুমারের সঙ্গে কলকাতায় আসেন। রানি রাসমণি তখন দক্ষিণেশ্বরে মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছেন; রামকুমার সেখানে পূজারি। দাদার মৃত্যুর পর ভার পড়ল গদাধরের উপর।
তারপরের কয়েক বছর তাঁর জীবনের সবচেয়ে প্রচণ্ড সময়। পূজা করতে গিয়ে তিনি কাঁদতেন, খেতে ভুলে যেতেন, ঘুম বন্ধ হয়ে গেল, চোখ দিয়ে জল পড়ে বুক ভাসত। লোকে বলত পাগল। শেষে খড়্গ তুলে নেওয়ার সেই মুহূর্ত — আর মায়ের দর্শন।
এরপরে এল সাধনার পর্ব। ভৈরবী ব্রাহ্মণী তাঁকে তন্ত্রের চৌষট্টিটি সাধনায় নিয়ে গেলেন; তোতাপুরী শেখালেন বেদান্ত ও নির্বিকল্প সমাধি। তিনি বৈষ্ণব ভাবে সাধনা করলেন, রামভাবে করলেন, এমনকি ইসলাম ও খ্রিস্টধর্মের পথেও কিছুদিন সাধনা করলেন — আর প্রতিবারই একই জায়গায় পৌঁছলেন।
সেখান থেকেই তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত কথা: ‘যত মত, তত পথ।’ তর্ক করে নয় — নিজে হেঁটে দেখে।
শেষ জীবনে গলার ক্যানসার। অসহ্য যন্ত্রণা, খাওয়া বন্ধ। নরেন্দ্রনাথ (পরে বিবেকানন্দ) একদিন বললেন, ‘আপনি মাকে একবার বলুন না, যেন একটু খেতে পারেন।’ তিনি মাকে বলতে গিয়ে ফিরে এসে বললেন, ‘মা বললেন — এতগুলো মুখ দিয়ে তো খাচ্ছ, তবু?’
কাহিনী
খড়্গ
দিনের পর দিন ডেকেও সাড়া নেই। রামকৃষ্ণ বলতেন, ‘একটা দিন গেল, মা এলেন না। এমনি করে জীবনটাই যাবে।’ মাটিতে মুখ ঘষতেন, গাল ছড়ে যেত।
একদিন আর পারলেন না। মন্দিরের দেওয়ালে মায়ের খড়্গ ঝোলানো ছিল। তিনি ছুটে গিয়ে সেটি নামালেন।
তারপর যা হল, তাঁর নিজের বর্ণনায় — ঘর, দরজা, মন্দির সব মুছে গেল। চারদিকে শুধু অখণ্ড চেতনার সমুদ্র, উজ্জ্বল, গর্জমান, ঢেউয়ের পর ঢেউ তাঁর দিকে ছুটে আসছে। সেই ঢেউয়ের ভিতর থেকে মা এলেন। তিনি জ্ঞান হারালেন।
বিড়ালকে ভোগ
দর্শনের পর তাঁর পূজা আর নিয়ম মানত না। একদিন ভোগ নিবেদনের আগেই মন্দিরের বিড়ালটাকে তিনি ভোগের খাবার খাইয়ে দিলেন।
খবর গেল মথুরবাবুর কাছে। তিনি এসে জিজ্ঞাসা করলেন। রামকৃষ্ণ বললেন, ‘দেখলাম মা-ই বিড়াল হয়ে এসেছেন। খেতে চাইলেন, দিলাম।’
মথুরবাবু কিছু বললেন না। ফিরে গিয়ে বলে দিলেন — ‘ওঁকে কেউ কিছু বলবে না।’
টাকা আর মাটি
মায়ের কাছে সাধনা করতে করতে তিনি একটি জিনিস বারবার অভ্যাস করতেন। এক হাতে টাকা, এক হাতে মাটি নিয়ে গঙ্গার ধারে বসতেন। বলতেন, ‘টাকা মাটি, মাটি টাকা’ — আর দুটোই জলে ফেলে দিতেন।
এতে তাঁর এমন অবস্থা হয়েছিল যে পরে ধাতুর টাকা হাতে ঠেকলেই হাত বেঁকে যেত, জ্বালা করত। ঘুমন্ত অবস্থায় বিছানার তলায় কেউ টাকা রেখে দিলে তিনি যন্ত্রণায় ছটফট করে উঠতেন।
শিষ্যরা একে অলৌকিক বলতেন। তিনি বলতেন, ‘অলৌকিক কিছু নয়। মন যা ছাড়ে, শরীরও তা আর নিতে পারে না।’
ষোড়শী পূজা
ফলহারিণী কালীপূজার রাত। দক্ষিণেশ্বরে নিজের ঘরে রামকৃষ্ণ পূজার আয়োজন করেছেন — আসন, ফুল, বেলপাতা, নৈবেদ্য, সব ঠিকঠাক।
কেবল প্রতিমা নেই।
তিনি নহবত থেকে সারদা দেবীকে ডেকে আনলেন, আর দেবীর আসনে বসালেন। তারপর নিজের স্ত্রীকে ষোড়শী ত্রিপুরসুন্দরী জ্ঞানে পূজা করলেন — মন্ত্র পড়ে, ফুল দিয়ে, সমস্ত উপচারে।
পূজা শেষে যা যা সাধনায় অর্জিত হয়েছিল, জপের মালা, সাধনার ফল — সব তিনি সেই পায়ে সমর্পণ করলেন।
শাক্ত সাধনার একটা কথা এখানে ঘটনায় দাঁড়িয়ে গেল। শাস্ত্র বলে, নারীমাত্রেই দেবীর অংশ। বলা সহজ। নিজের স্ত্রীকে আসনে বসিয়ে পূজা করা সহজ নয়।
তারিখটা নিয়ে দুটো মত আছে, আর দুটোই সম্মানিত সূত্রের। ‘শ্রীশ্রীমায়ের কথা’ অনুসারে ৫ জুন ১৮৭২ — সারদা দেবী বলেছেন, দক্ষিণেশ্বরে আসার মাস-দেড়েক পরে। স্বামী সারদানন্দের লেখা জীবনীতে আবার ২৫ মে ১৮৭৩ — মা আসার প্রায় এক বছর পরে। এখানে দুটোই লিখে রাখা হল; কোনটা ঠিক, তার মীমাংসা হয়নি।
বামাক্ষ্যাপা
১৮৩৭ – ১৯১১ · আটলা গ্রাম, বীরভূম · তারাপীঠ
তারাপীঠের মহাশ্মশানের সাধক — যিনি মাকে ‘মা’ ছাড়া কিছু বলতেন না
জীবন
বীরভূমের আটলা গ্রামে দরিদ্র ব্রাহ্মণ সর্বানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের ঘরে জন্ম। নাম বামাচরণ। ছেলেবেলা থেকেই অন্যরকম — পড়াশোনায় মন নেই, গোরু চরাতে গিয়ে বসে থাকেন, মাটিতে ছবি আঁকেন।
বাবার মৃত্যুর পর সংসার চালাতে তিনি মলুটির মৌলীক্ষা মন্দিরে কাজ নেন, কিন্তু টিকল না। শেষে চলে এলেন তারাপীঠে — মন্দিরের পাশের মহাশ্মশানে।
সেখানে তাঁর গুরু হলেন কৈলাসপতি বাবা। শ্মশানেই সাধনা, শ্মশানেই থাকা। চিতার পাশে শুয়ে ঘুমোতেন, চিতাভস্ম মাখতেন। লোকে বলত ক্ষ্যাপা — সেই নামই থেকে গেল।
তাঁর সাধনায় কোনও আচার ছিল না। স্নান নেই, কাপড়ের ঠিক নেই, ভাষার ঠিক নেই। মাকে তিনি যা খুশি বলতেন — বকতেন, আদর করতেন, খাবার চাইতেন। কিন্তু তাঁর দর্শনের কথা গোটা বীরভূম জানত।
নাটোরের মহারানি ভবানীর পরিবার, বীরভূমের জমিদারেরা, দূরদূরান্তের মানুষ তাঁর কাছে আসতেন। তিনি কারও কাছে কিছু নিতেন না। যা পেতেন, শ্মশানের কুকুর আর ভিখারিদের বিলিয়ে দিতেন।
তারাপীঠ আজ যে চেহারায় আছে — মন্দির আর মহাশ্মশান পাশাপাশি, সাধকের পীঠ হিসেবে — তার অনেকটাই তাঁর জন্যই।
কাহিনী
মায়ের ভাত
মন্দিরে ভোগ সাজানো হয়েছে, নিবেদন তখনও হয়নি। বামা কোথা থেকে এসে থালা থেকে ভাত তুলে খেতে শুরু করলেন।
সেবাইতরা ছুটে এসে ‘অনাচার, অনাচার’ বলে তাঁকে মারতে মারতে বার করে দিল। বামা একটাও কথা বললেন না। শ্মশানের দিকে হাঁটতে হাঁটতে শুধু বললেন, ‘মা, তোর ছেলেকে খেতে দিলি না।’
মন্দির তখন নাটোর রাজবাড়ির। সেই রাতে নাটোরের রানি স্বপ্ন দেখলেন — মা তারা দাঁড়িয়ে, চোখ লাল। বলছেন, ‘ওরা আমার ছেলেকে মেরেছে। ও আগে খেলে আমিই আগে খাই। কাল থেকে ওকে আগে খাওয়াবি।’
পরদিন রানির নির্দেশে সেবাইতরা শ্মশানে গিয়ে বামার পায়ে ধরল। তারপর থেকে তারাপীঠে নিয়ম — আগে বামাক্ষ্যাপা, তারপর মা।
ঝড় থামানো
তারাপীঠে আজও একটি কথা বলাবলি হয়। একবার প্রবল ঝড় উঠেছে, মন্দিরের চাল উড়ে যাওয়ার উপক্রম, লোকজন ভয়ে ঘরে ঢুকে গেছে।
বামা শ্মশানে বসেছিলেন। উঠে এসে আকাশের দিকে তাকিয়ে মাকে বকতে শুরু করলেন — ‘এসব কী হচ্ছে? ছেলেপুলেগুলো ভয় পাচ্ছে। থাম!’
গ্রামের লোকের বিশ্বাস, ঝড় থেমে গিয়েছিল। তাঁরা বলেন, ও বাড়ির ছেলে বাড়ির লোককে ধমক দিয়েছিল, এই যা।
রাজার নৈবেদ্য
এক জমিদার বহু টাকার নৈবেদ্য নিয়ে এসেছেন, চান বামার আশীর্বাদ। থালা ভরা মিষ্টি, সোনার গয়না।
বামা তাকালেন না। পাশে বসা এক কুষ্ঠরোগী ভিখারিকে ডেকে বললেন, ‘নে, খা।’
জমিদার আহত হয়ে বললেন, ‘এ তো আপনার জন্য এনেছিলাম।’
বামা বললেন, ‘ও-ও তো মা। তুই যাকে ছুঁতে পারিস না, আমি তাকে খাওয়াই। তোর জিনিস তোর চেয়ে ভালো জায়গায় গেল।’
যে তরুণকে মন্ত্র দিলেন
বামাক্ষ্যাপা শিষ্য করার লোক নন। শ্মশানে থাকেন, যা মনে আসে করেন, লোকের ভিড় দেখলে তাড়িয়ে দেন।
তাঁর কাছে এলেন এক তরুণ — নদিয়ার কুতুবপুরের নলিনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়। অল্প বয়সে স্ত্রী মারা গেছেন, সেই শোক বুকে নিয়ে ঘুরছেন।
বামাক্ষ্যাপা তাঁকে মন্ত্র দিলেন।
সেই নলিনীকান্তই পরে স্বামী নিগমানন্দ — আসামে আশ্রম, পুরীতে সঙ্ঘ, পাঁচখানা গ্রন্থ, অসংখ্য শিষ্য।
তারাপীঠের শ্মশানে যিনি বসে থাকতেন, তাঁর একটা মন্ত্র এভাবে ব্রহ্মপুত্রের তীরে গিয়ে পৌঁছল।
সারদা দেবী
১৮৫৩ – ১৯২০ · জয়রামবাটী, বাঁকুড়া · দক্ষিণেশ্বর
শ্রীরামকৃষ্ণের সহধর্মিণী — ভক্তদের কাছে সাক্ষাৎ জগজ্জননী
জীবন
জয়রামবাটীর দরিদ্র ব্রাহ্মণ রামচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের মেয়ে সারদামণি। পাঁচ বছর বয়সে কামারপুকুরের গদাধরের সঙ্গে বিয়ে — তখনকার নিয়মে যা অস্বাভাবিক ছিল না।
আঠারো বছর বয়সে তিনি হেঁটে দক্ষিণেশ্বরে আসেন — শুনেছিলেন স্বামী পাগল হয়ে গেছেন, নিজের চোখে দেখতে চেয়েছিলেন। এসে দেখলেন, মানুষটি পাগল নন; তিনি অন্য কিছু।
রামকৃষ্ণ তাঁকে নিজের ঘরেই রাখলেন, আর ফলহারিণী কালীপূজার রাতে তাঁকে দেবীর আসনে বসিয়ে ষোড়শী রূপে পূজা করলেন। স্ত্রীকে জগন্মাতা বলে পূজা — এ ঘটনা বাংলার ধর্মজীবনে একেবারে আলাদা।
দক্ষিণেশ্বরে তিনি থাকতেন নহবতের ছোট ঘরে, যেখানে সোজা হয়ে দাঁড়ানোও কঠিন। রাঁধতেন, ভক্তদের খাওয়াতেন, আর সারাদিন প্রায় কারও চোখে পড়তেন না।
রামকৃষ্ণের দেহত্যাগের পর তিনিই হলেন সকলের আশ্রয়। বিবেকানন্দ সহ সন্ন্যাসীরা তাঁকে ‘মা’ বলতেন, আর কোনও বড় সিদ্ধান্তে তাঁর অনুমতি নিতেন। জাহাজে বিদেশে যাওয়ার আগে বিবেকানন্দ তাঁর সম্মতি চেয়েছিলেন।
তাঁর গোটা জীবনে বড় কোনও বক্তৃতা নেই, গ্রন্থ নেই। আছে রান্নাঘর, রোগীর সেবা, আর অল্প কয়েকটি কথা — যেগুলি আজও লক্ষ মানুষ আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছেন।
কাহিনী
আমজাদ
জয়রামবাটীর কাছে আমজাদ নামে এক মুসলমান যুবক ছিল — ডাকাতি-চুরির বদনাম, লোকে ভয়ে দূরে থাকত।
মা তাকে ডেকে খেতে দিতেন। একদিন সে খেতে বসেছে, মা নিজে পাশে বসে পাখা করছেন।
ভাইঝি নলিনী আপত্তি করল — ‘ওকে এত আস্কারা কেন?’ মা বললেন, ‘শরৎ আমার যেমন ছেলে, আমজাদও আমার তেমনি ছেলে।’ শরৎ মানে স্বামী সারদানন্দ।
খাওয়ার পর মা নিজে গিয়ে আমজাদের এঁটো জায়গা পরিষ্কার করলেন।
ডাকাত বাবা
তাঁর জীবনের একটি রাতের কথা লোকে ভোলেনি। জয়রামবাটী থেকে দক্ষিণেশ্বরে ফেরার পথে মা দলছুট হয়ে পড়েন। তেলোভেলো মাঠে অন্ধকারে একা।
সেখানে এক ডাকাত এসে দাঁড়াল। মা ভয় পেলেন না। বললেন, ‘বাবা, আমি পথ হারিয়েছি। আমাকে একটু পৌঁছে দেবে?’
ডাকাত থমকে গেল। মা তাকে বাবা বলে ডাকছেন। সে তার স্ত্রীকে ডেকে আনল, দুজনে মিলে মাকে ঘরে নিয়ে গেল, খাওয়াল, রাতে রাখল, পরদিন পৌঁছে দিল।
সারা জীবন মা তাদের বাবা-মা বলে ডেকেছেন।
শেষ কথা
জীবনের শেষদিকে, শয্যাশায়ী অবস্থায়, এক ভক্তিমতী মহিলা — অন্নপূর্ণার মা — কেঁদে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘মা, আমাদের কী হবে?’
তিনি বললেন — ‘যদি শান্তি চাও, মা, কারও দোষ দেখো না। দোষ দেখবে নিজের। জগৎকে আপনার করে নিতে শেখো। কেউ পর নয়, মা, জগৎ তোমার।’
এটিই তাঁর শেষ উপদেশ হিসেবে পরিচিত।
কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ
ষোড়শ – সপ্তদশ শতক · নবদ্বীপ, নদিয়া
‘বৃহৎ তন্ত্রসার’-এর রচয়িতা — বাংলার কালীমূর্তি যাঁর হাতে দাঁড়াল
জীবন
নবদ্বীপের পণ্ডিত, তন্ত্রশাস্ত্রে অসামান্য অধিকারী। তাঁর সংকলিত ‘বৃহৎ তন্ত্রসার’ আজও বাংলার পূজাপদ্ধতির অন্যতম ভিত্তি — দশমহাবিদ্যার ধ্যান, মন্ত্র ও বিধি এক জায়গায়।
প্রচলিত বিশ্বাস, বাংলায় দক্ষিণাকালীর যে মূর্তিরূপ আজ ঘরে ঘরে পূজিত হয় — মুক্তকেশী, চতুর্ভুজা, শিবের বুকে দাঁড়ানো — তার প্রচলন তাঁরই হাতে।
কাহিনী
যে মূর্তি স্বপ্নে এল
কাহিনী বলে, কৃষ্ণানন্দ কালীর মূর্তি কেমন হবে তা নিয়ে দীর্ঘদিন স্থির করতে পারছিলেন না। শাস্ত্রে ধ্যানমন্ত্র আছে, কিন্তু মূর্তি গড়তে গেলে চোখের সামনে একটা রূপ লাগে।
দেবী তাঁকে স্বপ্নে বললেন, ‘কাল সকালে প্রথম যে নারীকে দেখবে, তার মতো করেই গড়ো।’
পরদিন ভোরে তিনি দেখলেন — এক শ্যামবর্ণা গ্রাম্য বধূ বাঁ হাতে ঘুঁটে দিচ্ছে, ডান হাত তুলে ঘরের দেওয়ালে ছাপ মারছে, আর অপরিচিত পুরুষ সামনে পড়ে যাওয়ায় লজ্জায় জিভ কেটেছে।
সেই ভঙ্গিই হয়ে গেল বাংলার কালীমূর্তি — এক হাত বর, এক হাত অভয়, আর কাটা জিভ।
স্বামী বিবেকানন্দ
১৮৬৩ – ১৯০২ · সিমলা, কলকাতা
যিনি ধ্বংসকেও মা বলে বরণ করার সাহস দেখিয়েছিলেন
জীবন
নরেন্দ্রনাথ দত্ত — আইনজীবী বিশ্বনাথ দত্তের ছেলে, কলেজে পাশ্চাত্য দর্শনের ছাত্র, ব্রাহ্মসমাজের প্রভাবে মূর্তিপূজায় অবিশ্বাসী। দক্ষিণেশ্বরে তিনি গিয়েছিলেন তর্ক করতে।
রামকৃষ্ণের কাছে তাঁর প্রথম প্রশ্ন ছিল, ‘আপনি ঈশ্বর দেখেছেন?’ উত্তর এল — ‘হ্যাঁ, দেখেছি। তোকে যেমন দেখছি, তেমনি — বরং আরও স্পষ্ট।’ এ উত্তর তিনি আগে কারও কাছে পাননি।
বাবার আকস্মিক মৃত্যুর পর সংসারে চরম দারিদ্র্য। অনেক দিন না খেয়ে থাকতেন, বাড়িতে বলতেন বন্ধুর বাড়ি খেয়ে এসেছেন, যাতে মা-ভাইবোনের ভাগে বেশি পড়ে।
রামকৃষ্ণের চলে যাওয়ার পর সন্ন্যাস, পরিব্রাজক জীবন, কন্যাকুমারীর শিলা, তারপর ১৮৯৩-এর শিকাগো। ফিরে এসে রামকৃষ্ণ মিশন — সেবাকেই সাধনা বলে প্রতিষ্ঠা।
কাহিনী
টাকা চাইতে গিয়ে
সংসারে তখন খাবার নেই। নরেন্দ্র রামকৃষ্ণকে বললেন, ‘আপনি মাকে বলুন, আমার সংসারের কষ্টটা যেন যায়।’
রামকৃষ্ণ বললেন, ‘আমি বলব কেন? তুই নিজে গিয়ে বল। আজ মঙ্গলবার, রাতে মন্দিরে যা।’
নরেন্দ্র গেলেন। মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে মুখ দিয়ে বেরোল — ‘মা, আমাকে জ্ঞান দাও, ভক্তি দাও, বৈরাগ্য দাও।’ টাকার কথা মনেই পড়ল না।
ফিরে এসে বললেন, ‘ভুলে গেছি।’ রামকৃষ্ণ পাঠালেন আবার। দ্বিতীয়বারেও একই কথা। তৃতীয়বারেও।
তখন তিনি বুঝলেন, তাঁর জন্য ওই জিনিসগুলোই চাওয়ার ছিল — মা তাঁকে দিয়ে সেটাই চাইয়ে নিয়েছেন।
কালী দ্য মাদার
নরেন্দ্র প্রথমে কালীকে মানতেন না। মূর্তি, খড়্গ, মুণ্ডমালা — তাঁর যুক্তিবাদী মনে এসব ছিল কুসংস্কার। রামকৃষ্ণের কাছে থেকে সেই বাধা ধীরে ধীরে ভাঙে।
১৮৯৮ সালের অগস্ট, কাশ্মীরের শ্রীনগর। এক সন্ধ্যায় তিনি ইংরেজিতে লিখলেন ‘Kali the Mother’ — যে কবিতায় দুঃখ, মৃত্যু, ধ্বংসকেও মায়ের রূপ বলে বরণ করা হয়েছে। কবিতার শেষ কথা: যে দুঃখকে ভালোবাসার সাহস রাখে, মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে, ধ্বংসের নাচে নাচে — মা তারই কাছে আসেন।
তাঁর ভাষায় — যে কেবল সুখ চায়, সে মাকে অর্ধেক দেখে। এর কয়েক সপ্তাহ পরে তিনি ক্ষীরভবানীতে যান।
ক্ষীরভবানীতে
১৮৯৮ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর। কাশ্মীরে ক্ষীরভবানীর মন্দিরে বিবেকানন্দ একা গেলেন। সাত দিন রইলেন, ক্ষীর নিবেদন করে দেবীর পূজা করলেন।
মন্দিরটা ভাঙা। বহুকাল আগে আক্রমণে সেটা ধ্বংস হয়েছিল, আর তারপর কেউ গড়ে তোলেনি।
ভাঙা মন্দিরের সামনে বসে তাঁর মনে একটা ক্ষোভ জাগল — ‘মা এখানে কত যুগ ধরে আছেন। মন্দির ভেঙে দিল, অথচ এখানকার লোক মাকে রক্ষা করার জন্য কিছুই করল না। আমি যদি সেদিন থাকতাম…’
কথা শেষ হওয়ার আগেই তিনি উত্তর পেলেন। যেন কেউ বলছেন — তুমি আমাকে রক্ষা কর, না আমি তোমাকে রক্ষা করি? আমি ইচ্ছে করলে এখানে এখনই সাততলা সোনার মন্দির উঠতে পারে।
প্রশ্নটা তাঁর সমস্ত হিসেব উল্টে দিল। যিনি জগৎ ধারণ করে আছেন, তাঁকে রক্ষা করার কল্পনাটাই অহংকার।
কাশ্মীর থেকে ফিরে তিনি বদলে গিয়েছিলেন। যাঁরা দেখেছেন তাঁরা বলেন, এরপর তিনি সর্বত্র মাকে দেখতেন।
সর্বানন্দ ঠাকুর
আনুমানিক পঞ্চদশ শতক · মেহার, চাঁদপুর (বাংলাদেশ)
প্রচলিত বিশ্বাস — যিনি এক রাতে দশ মহাবিদ্যারই দর্শন পেয়েছিলেন
জীবন
সর্বানন্দ ঠাকুরকে নিয়ে ইতিহাসের চেয়ে বিশ্বাস বেশি। প্রচলিত কাহিনী বলে, তিনি ছিলেন দরিদ্র, আর তাঁর গুরু তাঁকে দশমহাবিদ্যার সাধনায় দীক্ষা দেন।
মেহারে (তখনকার ত্রিপুরা জেলা, এখন বাংলাদেশের চাঁদপুর জেলা) এক অমাবস্যার রাতে শ্মশানে সাধনা করতে বসে তিনি নাকি একে একে দশ মহাবিদ্যারই দর্শন পান — কালী থেকে কমলা পর্যন্ত।
এই কাহিনী দশমহাবিদ্যা-উপাসনার ধারায় একটি বড় স্মারক হয়ে আছে, কারণ দশটি রূপকে এক সূত্রে গাঁথা সাধকের নজির বিরল।
কাহিনী
গুরুর পরীক্ষা
কাহিনী বলে, দীক্ষার আগে গুরু তাঁকে বলেছিলেন, ‘যা পাবি, তার এক কণাও নিজের জন্য রাখবি না।’
দর্শনের পর সর্বানন্দকে বহু মানুষ ঘিরে ধরল — কেউ রোগ সারাতে, কেউ ধন চাইতে।
তিনি কিছুই নিজের জন্য রাখেননি বলেই প্রচলিত বিশ্বাস। তাঁকে নিয়ে গড়ে ওঠা ধারাটি আজও পূর্ববঙ্গে মুখে মুখে চলে।
ভৈরবী ব্রাহ্মণী (যোগেশ্বরী)
উনবিংশ শতক; দক্ষিণেশ্বরে ১৮৬১ – ১৮৭৩ · যশোহর জেলা, বর্তমান বাংলাদেশ
যে সন্ন্যাসিনী রামকৃষ্ণকে চৌষট্টিখানা তন্ত্রের সাধনা করিয়েছিলেন
জীবন
শাক্ত সাধনার ইতিহাসে এ এক আশ্চর্য নাম — যাঁর জন্মসাল জানা নেই, মৃত্যুর দিন জানা নেই, প্রকৃত নামটাও নিশ্চিত নয়; অথচ উনিশ শতকের বাংলার সবচেয়ে বিখ্যাত সাধকটির তন্ত্রসাধনা সম্পূর্ণ হয়েছিল তাঁরই হাতে।
জন্ম যশোহর জেলার এক ব্রাহ্মণ পরিবারে। ঘর ছেড়ে তিনি ভৈরবী হয়েছিলেন — গৈরিক বসন, সঙ্গে পুঁথি, পায়ে হেঁটে তীর্থে তীর্থে। শাস্ত্রে তাঁর দখল ছিল প্রবল; তন্ত্র, পুরাণ, বৈষ্ণব শাস্ত্র — সবই কণ্ঠস্থ।
১৮৬১ সালে তিনি নৌকো করে দক্ষিণেশ্বরে আসেন। রামকৃষ্ণ তখন বাগানে ফুল তুলছিলেন। বয়সে তিনি রামকৃষ্ণের চেয়ে প্রায় পনেরো বছরের বড় — চল্লিশের কাছাকাছি।
তখন রামকৃষ্ণের অবস্থা নিয়ে দক্ষিণেশ্বরে দুশ্চিন্তা। কেউ বলে ব্যাধি, কেউ বলে মাথা খারাপ। ভৈরবী দেখে বললেন — এ ব্যাধি নয়, এ মহাভাব; শাস্ত্রে এর বর্ণনা আছে। তিনি পুঁথি খুলে লক্ষণ মিলিয়ে দেখালেন।
তারপর শুরু হল সাধনা। কুমারীপূজা থেকে আরম্ভ করে তিনি রামকৃষ্ণকে চৌষট্টিখানা প্রধান তান্ত্রিক সাধনার ভিতর দিয়ে নিয়ে গেলেন। ১৮৬৩ সালে তা সম্পূর্ণ হয়। প্রতিটি সাধনায় সময় লেগেছিল মাত্র তিন দিন করে।
বৈষ্ণব পণ্ডিতদের সভায় তিনিই প্রথম ঘোষণা করেন, রামকৃষ্ণ অবতার। সেদিন সভায় তর্ক হয়েছিল, আর তিনি শাস্ত্র দিয়েই কথাটা প্রতিষ্ঠা করেন।
প্রায় বারো বছর তিনি দক্ষিণেশ্বরের কাছে আড়িয়াদহে ছিলেন। তারপর একদিন চলে যান। কোথায় গেলেন, কবে কোথায় দেহ রাখলেন — কিছুই জানা যায়নি। শাক্ত সাধনার ধারায় এটাই বোধহয় সবচেয়ে বড় ঋণ, যা কেউ শোধ করতে পারেনি।
কাহিনী
ব্যাধি নয়, মহাভাব
দক্ষিণেশ্বরে তখন সবাই উদ্বিগ্ন। ভাবের ঘোরে রামকৃষ্ণের শরীর জ্বলে উঠত, বুকে-গলায় লাল হয়ে যেত, অচৈতন্য হয়ে পড়তেন। কবিরাজ এসেছেন, ওষুধ চলেছে, কিছুতেই কিছু হয়নি। মথুরবাবু ভাবছেন, ছেলেটার মাথা খারাপ হয়ে গেল কি না।
ভৈরবী এসে কয়েক দিন লক্ষ করলেন। তারপর বললেন — ‘এ ব্যাধি নয়। এর নাম মহাভাব। এ রাধারানীর হয়েছিল, চৈতন্যদেবের হয়েছিল। শাস্ত্রে এর উনিশটা লক্ষণ লেখা আছে।’
তিনি পুঁথি আনিয়ে এক-একটা লক্ষণ পড়ে মিলিয়ে দেখাতে লাগলেন। সব মিলে গেল।
যে অবস্থাকে ঘরের লোক রোগ ভেবে ভয় পাচ্ছিল, শাস্ত্র জানা এক সন্ন্যাসিনী এসে তার নামটা ধরিয়ে দিলেন। নাম জানা থাকলে ভয় কমে যায় — সেদিন দক্ষিণেশ্বরে তাই হয়েছিল।
তিন দিনে এক সাধনা
তন্ত্রের সাধনা সহজ নয়। এক-একটা সাধনায় সাধকের বছরের পর বছর কেটে যায়; অনেকে এক জীবনে একটাও সম্পূর্ণ করতে পারেন না।
ভৈরবী ব্রাহ্মণী রামকৃষ্ণকে চৌষট্টিখানা প্রধান সাধনার ভিতর দিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। ১৮৬১-তে আরম্ভ, ১৮৬৩-তে শেষ।
প্রতিটাতে লেগেছিল তিন দিন করে।
ভৈরবী নিজেই অবাক হতেন। তিনি নির্দেশ দিতেন, আসন পেতে দিতেন, আর দেখতেন — যা করতে বলা হয়েছে তা করার আগেই সিদ্ধি এসে গেছে। গুরু শেখাচ্ছেন, অথচ শিষ্য পৌঁছে বসে আছে।
স্বামী নিগমানন্দ পরমহংস
১৮৮০ – ১৯৩৫ · কুতুবপুর, নদিয়া — এখন মেহেরপুর, বাংলাদেশ
বামাক্ষ্যাপার তান্ত্রিক শিষ্য; চার ধারার সাধনাতেই সিদ্ধ
জীবন
জন্মনাম নলিনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়। জন্ম ১৮ আগস্ট ১৮৮০, নদিয়ার কুতুবপুর গ্রামে — জায়গাটা এখন বাংলাদেশের মেহেরপুর জেলায়।
অল্প বয়সে বিয়ে, তারপর অল্প বয়সেই স্ত্রীবিয়োগ। সেই শোকই তাঁকে সাধনায় ঠেলে দেয়। কথিত আছে, স্ত্রীর রূপেই তিনি তারাদেবীর দর্শন পেয়েছিলেন — সংসারের শোক থেকে সাধনার শুরু, বাংলার সাধকজীবনে এ বারবার দেখা যায়।
তন্ত্রের দীক্ষা তিনি পান তারাপীঠে — বামাক্ষ্যাপার কাছে। এই একটা সূত্রে বীরভূমের শ্মশানের সাধক আর আসামের আশ্রমপ্রতিষ্ঠাতা এক হয়ে যান।
তিনি থামেননি। পুষ্করে সচ্চিদানন্দ সরস্বতীর কাছে বেদান্ত, ১৯০৩-এ সুমেরু দাসজির কাছে যোগ, আর ভক্তির সাধনা গৌরী মায়ের কাছে। চার ধারা — তন্ত্র, জ্ঞান, যোগ আর প্রেম — চারটেতেই তিনি সিদ্ধ বলে গণ্য।
পাঁচখানা বই লিখেছেন, আর তাদের নামেই তাঁর জীবনের নকশা: ‘ব্রহ্মচর্য সাধন’, ‘যোগী গুরু’, ‘জ্ঞানী গুরু’, ‘তান্ত্রিক গুরু’ আর ‘প্রেমিক গুরু’।
১৯১২ সালে আসামের কোকিলামুখে শান্তি আশ্রম — পরে সারস্বত মঠ — প্রতিষ্ঠা করেন। গারো পাহাড়ে যোগাশ্রম, পুরীতে নীলাচল সারস্বত সঙ্ঘ। দেহ রাখেন ২৯ নভেম্বর ১৯৩৫, কলকাতায়।
কাহিনী
শ্মশান থেকে আশ্রম
তারাপীঠের শ্মশানে বামাক্ষ্যাপা। দিগম্বর, ভাবে বিভোর, চিতার পাশে বসে থাকেন। শিষ্য করার লোক তিনি নন — কাউকে ডাকেন না, কারও জন্য অপেক্ষা করেন না।
সেখানে এলেন এক তরুণ, স্ত্রীবিয়োগের শোক বুকে নিয়ে। তাঁকেই বামাক্ষ্যাপা মন্ত্র দিলেন।
সেই তরুণই পরে আসামের কোকিলামুখে আশ্রম গড়লেন, পুরীতে সঙ্ঘ গড়লেন, পাঁচখানা বই লিখলেন, শত শত শিষ্য হল।
বীরভূমের শ্মশানে যে আগুন, আসামের আশ্রমে সেটাই প্রদীপ হয়ে জ্বলল। ধারা এভাবেই চলে — শ্মশানের এক ভাবোন্মত্ত সাধকের কাছ থেকে জন্ম নেন এক সংগঠক।
গৌরী মা
১৮৫৭ – ১৯৩৮ · শিবপুর, হাওড়া
যে মেয়ে বেশ বদলে একা তীর্থে তীর্থে হেঁটেছিলেন
জীবন
জন্মনাম মৃড়ানী। জন্ম ১৮৫৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে, হাওড়ার শিবপুরে।
ছোট বয়স থেকেই ধর্মে গভীর টান। তারপর যা করলেন, সেকালের মেয়ের পক্ষে তা প্রায় অকল্পনীয় — ১৮৭৫ সালে, আঠারো বছর বয়সে, তিনি ঘর ছেড়ে তীর্থে বেরিয়ে পড়লেন। একা। বেশ বদলে, যাতে পথে কেউ মেয়ে বলে না চেনে।
রেলে, পায়ে হেঁটে, ভারতবর্ষের তীর্থে তীর্থে তিনি ঘুরেছেন। উপোস, মৌন, ধ্যান — সঙ্গে শাস্ত্রপাঠ।
দক্ষিণেশ্বরে রামকৃষ্ণের কাছে এসে তিনি থেকে গেলেন। রামকৃষ্ণ তাঁর সম্বন্ধে বলতেন — ‘গৌরী সিদ্ধ, বৃন্দাবনের গোপী।’ সারদা দেবীর সঙ্গিনী হয়ে তিনি দক্ষিণেশ্বরে থাকতেন; রামকৃষ্ণের জন্য রাঁধতেন, গান গাইতেন।
রামকৃষ্ণ তাঁকে সন্ন্যাস দেন, নাম রাখেন গৌরীআনন্দ। লোকে বলে গৌরী মা।
১৮৯৫ সালে তিনি ব্যারাকপুরে গঙ্গার ধারে সারদেশ্বরী আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন — মেয়েদের লেখাপড়া আর সাধনার জন্য। ১৯১১-তে আশ্রম কলকাতায় সরে আসে, ১৯২৪-এ তিনতলা নিজস্ব বাড়ি ওঠে। দেহ রাখেন ১ মার্চ ১৯৩৮।
স্বামী নিগমানন্দ ভক্তির সাধনা শিখেছিলেন এঁরই কাছে।
কাহিনী
পথে একা
১৮৭৫ সাল। আঠারো বছরের এক মেয়ে ঘর ছেড়ে তীর্থে বেরোচ্ছে — সেকালে এ কেবল অস্বাভাবিক নয়, বিপজ্জনক।
তিনি বেশ বদলালেন। পথে যাতে কেউ মেয়ে বলে চিনতে না পারে, তার ব্যবস্থা করে বেরিয়ে পড়লেন।
রেলে চড়ে, পায়ে হেঁটে, বছরের পর বছর তিনি ঘুরেছেন। উপোস করেছেন, মৌন থেকেছেন, ধ্যান করেছেন।
পরে যখন তিনি মেয়েদের জন্য আশ্রম গড়লেন, তখন সেই আশ্রমের ভিত কেবল ভক্তি নয় — নিজের পায়ে হাঁটা বছরগুলোও।
ভবা পাগলা
১৯০২ – ১৯৮৪ · আমতা, ঢাকা — পরে পশ্চিমবঙ্গ
কালীভক্ত গীতিকার — যাঁর গান আজও গ্রামে গাওয়া হয়
জীবন
পুরো নাম ভবেন্দ্রমোহন সাহা। জন্ম ১৭ অক্টোবর ১৯০২, তখনকার ঢাকা জেলার আমতা গ্রামে — জায়গাটা এখন বাংলাদেশের ধামরাই উপজেলায়। পরিবার ছিল ছোট জমিদার শ্রেণির।
তিনি কালীর ভক্ত। সাধনা আর গান — দুটোই তাঁর জীবনে একসঙ্গে চলেছে। হারমোনিয়াম আর বেহালা বাজাতেন।
গান তিনি লিখেছেন হাজারে হাজারে — শাক্ত পদ, দেহতত্ত্ব, বাউলাঙ্গের গান। বাংলাদেশ আর পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে সেই গান এখনও গাওয়া হয়; অনেকে জানেনও না গানটা কার।
দেশভাগের পর তিনি পশ্চিমবঙ্গে চলে আসেন। স্ত্রী শৈবলিনী দেবী, তিন সন্তান।
নিজের প্রচার তিনি সহ্য করতে পারতেন না। তাঁর একটা কথা প্রচলিত — ‘লোকে যদি আমাকে চিনে ফেলে, আমি গোবর হয়ে যাব।’
দেহ রাখেন ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৪।
কাহিনী
গোবর হয়ে যাব
ভবা পাগলার নাম ছড়াচ্ছে। লোক আসছে, ভিড় বাড়ছে, শিষ্য হওয়ার জন্য অনেকে ব্যস্ত।
তিনি বিরক্ত হতেন। বলতেন — ‘লোকে যদি আমাকে চিনে ফেলে, আমি গোবর হয়ে যাব।’
কথাটা রূঢ় শোনায়, কিন্তু ভিতরে একটা হিসেব আছে। যাঁর গান গ্রামে গ্রামে গাওয়া হচ্ছে, তাঁর আর নামের দরকার কী। গান থাকলেই যথেষ্ট; গায়কের নাম ভুলে গেলে গানটার কোনও ক্ষতি হয় না।
সত্যিই আজ বহু গ্রামে তাঁর গান গাওয়া হয়, অথচ গায়ক জানেন না পদটা কার লেখা। ভবা পাগলা যা চেয়েছিলেন, ঠিক তাই ঘটেছে।
ত্রৈলঙ্গ স্বামী
মৃত্যু ২৬ ডিসেম্বর ১৮৮৭, বারাণসী · বিজয়নগরম থেকে বারাণসী
বারাণসীর ‘চলমান শিব’ — রামকৃষ্ণ যাঁকে দেখতে গিয়েছিলেন
জীবন
এঁর জীবনী নিয়ে সাবধান হওয়া দরকার। প্রচলিত কথায় জন্ম ১৬০৭ সালে, মৃত্যু ১৮৮৭-তে — অর্থাৎ আয়ু ২৮০ বছর। এ দীর্ঘায়ুর কিংবদন্তি; ইতিহাস নয়। মৃত্যুর তারিখটুকুই কেবল নিশ্চিত — ২৬ ডিসেম্বর ১৮৮৭, বারাণসী।
জন্ম দক্ষিণে, বিজয়নগরমে। পরে তিনি বারাণসীতে এসে থেকে যান। গঙ্গার ঘাটে, মন্দিরের চাতালে — বস্ত্রহীন, প্রায় নিরাহার।
উনিশ শতকের বারাণসীতে তিনি ছিলেন সর্বজনবিদিত। বহু বাঙালি তীর্থযাত্রী তাঁকে দেখে এসেছেন, আর বাংলার সাধকসমাজে তাঁর কথা ছড়িয়েছে।
রামকৃষ্ণ বারাণসীতে গিয়ে তাঁকে দেখে আসেন। প্রচলিত কথায় রামকৃষ্ণ বলেছিলেন, ইনি বারাণসীর চলমান বিশ্বনাথ।
তাঁকে নিয়ে যে অলৌকিক কাহিনীগুলো চলে — জলের উপর বসে থাকা, বিষপান — সেগুলোর কোনওটারই সমসাময়িক প্রমাণ নেই। এখানে সেগুলো কিংবদন্তি হিসেবেই রাখা হল, ঘটনা হিসেবে নয়।
কাহিনী
দুশো আশি বছর
ত্রৈলঙ্গ স্বামীর বয়স নিয়ে যে কথা চলে, তা এইরকম — জন্ম ১৬০৭, মৃত্যু ১৮৮৭। অর্থাৎ তিনি দুশো আশি বছর বেঁচেছিলেন।
ভক্তের কাছে এ মাহাত্ম্য। ইতিহাসের কাছে এ অসম্ভব।
কিন্তু কথাটা কেন উঠল, তা ভাববার মতো। উনিশ শতকের বারাণসীতে যখন তিনি বৃদ্ধ, তখন লোকে দেখেছে এমন এক সাধুকে যাঁর বয়স কেউ আন্দাজ করতে পারে না। যাঁর শুরুটা কেউ দেখেনি, তাঁর শুরু লোকে অনেক পিছিয়ে দেয়।
এই পাতায় তাই তাঁর মৃত্যুর তারিখটুকুই তারিখ বলে লেখা — বাকিটা কাহিনী বলে।