কাহিনী
প্রতিটি রূপের আবির্ভাবের কাহিনী — সংক্ষেপে নয়, গোড়া থেকে। শেষে ভক্তের কথা ও লীলা।
আবির্ভাবের কাহিনী
কালী
দশমহাবিদ্যার আবির্ভাব — দক্ষযজ্ঞের দিন
কাহিনীর শুরু এক অপমানে। প্রজাপতি দক্ষ মহাযজ্ঞের আয়োজন করেছেন। ত্রিভুবনের সকলে নিমন্ত্রিত — দেবতা, ঋষি, গন্ধর্ব, সিদ্ধ। ডাক পাননি কেবল দুজন: দক্ষের নিজের মেয়ে সতী, আর তাঁর জামাতা শিব। কারণটা পুরনো — দক্ষ শিবকে সহ্য করতে পারেন না। শ্মশানে থাকেন, গায়ে ছাই, সঙ্গী ভূত-প্রেত; এমন লোককে দক্ষ জামাই বলে মানতে রাজি নন।
সতী খবর পেলেন। বাপের বাড়িতে যজ্ঞ হচ্ছে, আর তাঁকে ডাকা হয়নি — এ কথা মেয়ের বুকে যেভাবে বাজে, সেভাবেই বাজল। তিনি শিবকে বললেন, ‘আমি যাব।’ শিব বারণ করলেন। বললেন, ‘যেখানে ডাক নেই, সেখানে গেলে সম্মান থাকে না। তোমার বাবা আমাকে অপমান করবেন, আর সে অপমান তোমার গায়েই লাগবে।’ সতী বললেন, ‘বাবার বাড়ি যেতে নিমন্ত্রণ লাগে না।’ শিব তবু বারণ করলেন।
তখন সেই ঘটনাটি ঘটল, যেটি গোটা দশমহাবিদ্যা-তত্ত্বের ভিত। সতী বোঝালেন না, রাগও করলেন না। তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন, আর তাঁর শরীর বদলাতে লাগল। শিব দেখলেন — তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন করালবদনা এক মূর্তি, গায়ের রং মেঘের মতো কালো, মুখ থেকে জিহ্বা বেরিয়ে আছে, গলায় মুণ্ডমালা।
শিব পিছিয়ে যেতে গেলেন — আর দেখলেন, পিছনেও এক দেবী দাঁড়িয়ে। ডান দিকে একজন, বাঁ দিকে একজন, উপরে, নীচে। দশ দিক জুড়ে দশটি মূর্তি, দশ রকমের, একজন ভয়ংকরী, একজন পরমাসুন্দরী, একজন বৃদ্ধা বিধবা, একজন নিজের মাথা হাতে নিয়ে দাঁড়ানো। শিব যেদিকেই তাকান, সতী। পালানোর পথ নেই।
দশজনের মধ্যে যিনি সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তিনিই কালী — প্রথমা। শিব তখন বুঝলেন, যাঁকে তিনি ঘরের বউ বলে জানতেন, তিনি ঘরের বউ নন; তিনি সেই শক্তি, যাঁর একটি প্রকাশমাত্র এই সংসার। শিব অনুমতি দিলেন। সতী গেলেন।
বাকিটা সকলেই জানে। যজ্ঞসভায় দক্ষ শিবকে নিয়ে যা বলার বলে গেলেন। সতী সহ্য করতে পারলেন না — বাপের সামনেই যোগাগ্নিতে দেহ ত্যাগ করলেন। শিব সেই দেহ কাঁধে তুলে যে তাণ্ডব শুরু করলেন, তা থামাতে বিষ্ণুকে চক্র দিয়ে দেহ খণ্ড খণ্ড করে ছড়িয়ে দিতে হল। যেখানে যে অঙ্গ পড়ল, সেখানেই এক-একটি পীঠ। কালীঘাট, তারাপীঠ, কামাখ্যা — সব এই ছড়িয়ে পড়া থেকে।
চণ্ডীর কালী — চণ্ড, মুণ্ড ও রক্তবীজ
দ্বিতীয় কাহিনীটি চণ্ডীর, আর এটিই বাংলার ঘরে বেশি চেনা। শুম্ভ ও নিশুম্ভ দুই অসুর ভাই ত্রিভুবন দখল করেছে। দেবতারা হিমালয়ে গিয়ে মহামায়ার স্তব করছেন। পার্বতীর দেহকোষ থেকে বেরিয়ে এলেন উজ্জ্বলবর্ণা এক দেবী — কৌশিকী; আর যিনি রয়ে গেলেন, তিনি কালো হয়ে গেলেন বলে নাম হল কালিকা।
কৌশিকীর রূপ দেখে শুম্ভের দূত বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এল — ‘এমন রত্ন নারীজাতির, এ তো আমাদের প্রভুরই প্রাপ্য।’ দেবী উত্তর দিলেন এক শর্তে: ‘যে আমাকে যুদ্ধে হারাবে, আমি তারই।’ শুম্ভ পাঠালেন ধূম্রলোচনকে; সে ছাই হয়ে গেল। তারপর পাঠালেন চণ্ড আর মুণ্ডকে।
চণ্ড-মুণ্ড এসে দেখল, সিংহের পিঠে বসে দেবী হাসছেন। দুজনে অস্ত্র তুলল। তখন অম্বিকার ভ্রূ কুঁচকে গেল — আর সেই কুঁচকানো ললাট কালো হয়ে উঠল, যেন কালির পোঁচ। সেই কালো থেকে বেরিয়ে এলেন এক মূর্তি: হাড়জিরজিরে দেহ, হাতে খড়্গ আর পাশ, গায়ে বাঘছাল, কাঁধে খট্বাঙ্গ, মুখ হাঁ-করা, জিহ্বা লকলক করছে, চোখ গর্তে ঢোকা আর লাল। তাঁর হুংকারে আকাশ ফাটল।
তিনি অসুরসৈন্যের মধ্যে ঢুকে পড়লেন। হাতি ধরে মুখে পুরে চিবিয়ে ফেললেন, রথ-ঘোড়া-সারথি একসঙ্গে গিলে ফেললেন। চণ্ডকে ধরলেন চুলের মুঠি ধরে, খড়্গের এক কোপে মাথা নামিয়ে দিলেন। মুণ্ড পালাতে গেল, তারও একই দশা। দুটি মাথা হাতে ঝুলিয়ে তিনি অম্বিকার সামনে এসে দাঁড়ালেন — ‘এই নাও তোমার দুই পশু।’ অম্বিকা হেসে বললেন, ‘চণ্ড আর মুণ্ডকে যেহেতু তুমি এনেছ, জগতে তোমার নাম হবে চামুণ্ডা।’
কিন্তু আসল পরীক্ষা তখনও বাকি। রক্তবীজ। তার বর ছিল — দেহের এক ফোঁটা রক্ত মাটিতে পড়লে সেই রক্ত থেকে সমান শক্তির আর একটি রক্তবীজ জন্মাবে। দেবীর অস্ত্রে যত আঘাত, রণভূমিতে তত নতুন অসুর। শত থেকে সহস্র, সহস্র থেকে লক্ষ। দেবতারা আকাশ থেকে দেখে শিউরে উঠলেন — এ যুদ্ধ জেতা যায় না, কারণ শত্রুকে মারলেই সে বাড়ে।
তখন চণ্ডিকা কালীকে বললেন, ‘চামুণ্ডে, মুখ বাড়িয়ে দাও। আমি অস্ত্র চালাই, তুমি রক্ত ধরো — এক ফোঁটাও যেন মাটি না ছোঁয়।’ কালী জিহ্বা বিস্তার করলেন রণভূমির এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত। দেবীর ত্রিশূলে রক্তবীজের দেহ ফাটে, রক্ত ছিটকে ওঠে, আর মাটিতে পড়ার আগেই কালীর মুখে ঢুকে যায়। যত নতুন রক্তবীজ জন্মায়, কালী তাদেরও ধরে মুখে পোরেন। শেষে রক্তশূন্য, ফ্যাকাশে রক্তবীজ টলতে টলতে পড়ে গেল। জগৎ বাঁচল।
তত্ত্বটা এখানেই। কামনা-বাসনার একটা ফোঁটাও যদি মাটিতে পড়তে দাও, সেখান থেকে গোটা একটা নতুন বাসনা জন্মাবে। তাকে কেটে লাভ নেই; তাকে ধরতে হয়, পড়ার আগেই।
নৃত্য যেভাবে থামল
যুদ্ধ শেষ, কিন্তু কালীর নেশা কাটে না। রক্তে ভিজে, মুণ্ডমালা দুলিয়ে তিনি নাচছেন — আর তাঁর পায়ের চাপে পৃথিবী কাঁপছে। এ নাচ চললে সৃষ্টি থাকবে না। দেবতারা স্তব করলেন, কাজ হল না। কেউ সামনে দাঁড়াতে সাহস পাচ্ছে না।
তাঁরা গেলেন শিবের কাছে। শিব কিছু বললেন না। রণভূমিতে গিয়ে, মায়ের চলার পথে, শবের মতো চিত হয়ে শুয়ে পড়লেন।
নাচতে নাচতে মায়ের পা পড়ল একটা নরম কিছুর উপর। তিনি তাকিয়ে দেখলেন — নিজের স্বামীর বুক। সঙ্গে সঙ্গে নাচ থেমে গেল, আর লজ্জায় তিনি জিভ কাটলেন। বাংলার ঘরে ঘরে যে মূর্তি — মা দাঁড়িয়ে আছেন শিবের বুকে পা রেখে, জিহ্বা বার করা — সেটি ওই এক মুহূর্তের ছবি।
সাধকেরা অবশ্য আর একটা কথা বলেন। শিব শব, শক্তি জীবন্ত — শক্তি না থাকলে শিব নিজেও নিশ্চল। আর জিভ কাটা মানে রজোগুণকে সত্ত্বগুণ দিয়ে চেপে রাখা। যে যেভাবে দেখেন। মা কিন্তু দুভাবেই মা।
তারা
সমুদ্রমন্থন ও হলাহল
দেবতারা দুর্বাসার অভিশাপে শ্রীহীন হয়ে পড়েছেন। বিষ্ণুর পরামর্শে ঠিক হল — ক্ষীরসাগর মন্থন করতে হবে, অমৃত উঠবে। মন্দার পর্বত মন্থনদণ্ড, বাসুকি নাগ দড়ি। একদিকে দেবতা, অন্যদিকে অসুর। সমুদ্র ঘুরতে লাগল।
কিন্তু অমৃতের আগে উঠল বিষ। হলাহল — এমন বিষ যে তার ধোঁয়াতেই পাখি আকাশ থেকে পড়ে যায়, জল ফুটতে থাকে, লতাপাতা ঝলসে যায়। দুই পক্ষই দড়ি ছেড়ে পালাল। কেউ এগোয় না। ত্রিভুবন চোখের সামনে শেষ হয়ে যাচ্ছে।
তখন শিব এগিয়ে এলেন। অঞ্জলি ভরে বিষ তুলে নিলেন, আর কোনও প্রশ্ন না করে গিলে ফেললেন। পার্বতী ছুটে এসে তাঁর কণ্ঠ চেপে ধরলেন — বিষ যেন পেটে না নামে। কণ্ঠেই আটকে গেল হলাহল, আর সেই জায়গা নীল হয়ে গেল। নাম হল নীলকণ্ঠ।
বিষ আটকাল ঠিকই, কিন্তু জ্বালা থামল না। শিব যন্ত্রণায় অচেতন হয়ে পড়লেন। দেবতারা আবার নিরুপায়।
সেই সময় আবির্ভূতা হলেন দেবী তারা। তিনি এসে কী করলেন — এইখানেই কাহিনীটি অন্য সব কাহিনীর থেকে আলাদা। তিনি অস্ত্র তুললেন না, মন্ত্র পড়লেন না। তিনি মহাদেবকে কোলে তুলে নিলেন, শিশু করে ফেললেন, আর স্তন্যপান করালেন। মায়ের দুধে বিষের জ্বালা জুড়াল।
তাই তারাপীঠের শিলামূর্তিতে শিব মায়ের কোলে শিশু, স্তন্যপান করছেন। কালীর কাহিনীতে দেবী স্ত্রী, তারার এই কাহিনীতে দেবী মা। এই এক পার্থক্যেই দুই মহাবিদ্যার গোটা স্বভাব আলাদা হয়ে যায়। কালীর কাছে মানুষ যায় মুক্তি চাইতে; তারার কাছে যায় বিপদে পড়ে, যেমন শিশু মায়ের কাছে যায়।
বশিষ্ঠ ও চীনাচার — তারাপীঠ যেভাবে তৈরি হল
ঋষি বশিষ্ঠ তারামন্ত্র পেয়েছিলেন, কিন্তু সিদ্ধি পাননি। বছরের পর বছর তিনি নিয়ম মেনে, শুদ্ধাচারে, বৈদিক পদ্ধতিতে জপ করে গেলেন — অযুত, লক্ষ, কোটি। দেবী দেখা দিলেন না।
হতাশ হয়ে তিনি রেগে গিয়ে অভিশাপ দিতে উদ্যত হলেন। তখন আকাশবাণী হল — ‘তুমি আমাকে যে পথে ডাকছ, সে পথে আমি আসি না। মহাচীনে যাও। সেখানে বুদ্ধরূপে বিষ্ণু আছেন। তাঁর কাছে শেখো।’
বশিষ্ঠ গেলেন। গিয়ে যা দেখলেন, তাতে তাঁর মাথা ঘুরে গেল। সেখানে সাধনা চলছে এমন সব উপাচারে, যা তাঁর শাস্ত্রে নিষিদ্ধ — মদ, মাংস, নারী, শ্মশান। তিনি ভাবলেন, এ নিশ্চয়ই ভুল জায়গা।
বুদ্ধরূপী বিষ্ণু তাঁকে বললেন, ‘তুমি শুদ্ধি খুঁজছ বাইরে। মা বাইরের শুদ্ধি দেখেন না, ভিতরের টান দেখেন। যতদিন তুমি ভাববে কোনটা ছোঁয়া যায় আর কোনটা যায় না, ততদিন তুমি হিসাব করছ, ডাকছ না।’ এই পদ্ধতির নাম চীনাচার।
বশিষ্ঠ ফিরে এলেন, আর বীরভূমের দ্বারকা নদীর ধারে, শ্মশানের পাশে বসে সেই পথে সাধনা শুরু করলেন। এবার দেবী এলেন — সেই রূপে, যে রূপে তিনি শিবকে স্তন্য দিচ্ছেন। সেই জায়গাটিই তারাপীঠ।
পুরাণ আরও বলে, দক্ষযজ্ঞের পর সতীর দেহ যখন খণ্ড খণ্ড হয়ে পড়ছিল, এখানে পড়েছিল তাঁর নয়নতারা। তাই নাম তারাপীঠ, আর তাই এটি শক্তিপীঠও, সিদ্ধপীঠও।
ষোড়শী
ভণ্ডাসুর ও ললিতার আবির্ভাব
সতীর দেহত্যাগের পর শিব সমাধিতে বসেছেন। কতকাল, কেউ জানে না। ওদিকে তারকাসুরের অত্যাচারে দেবতারা অতিষ্ঠ; বর অনুযায়ী তাকে কেবল শিবের পুত্রই মারতে পারে। কিন্তু শিব সমাধিতে, আর পার্বতী তপস্যায়। কে তাঁকে জাগাবে?
দেবতারা কামদেবকে পাঠালেন। কামদেব ফুলের বাণ ছুঁড়লেন। শিবের সমাধি ভাঙল — আর তৃতীয় নয়ন খুলে গেল। এক পলকে কামদেব ভস্ম। রতি কাঁদতে কাঁদতে পড়ে রইলেন, আর ছাইয়ের স্তূপটি পড়ে রইল মাটিতে।
চিত্রকর্মা নামে শিবের এক গণ কৌতূহলবশে সেই ছাই মাখিয়ে একটা মানুষের আকৃতি গড়ল — নিছক খেলা। ব্রহ্মা পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। মূর্তিটি দেখে চমকে উঠে বললেন, ‘ভণ্ড! ভণ্ড!’ — আর সেই শব্দেই ছাইয়ের মূর্তি প্রাণ পেল। জন্ম নিল ভণ্ডাসুর।
কাম থেকে জন্ম, তাই তার প্রকৃতিও কামের। কিন্তু সে কাম ভালোবাসার কাম নয় — গিলে খাওয়ার কাম। তপস্যা করে সে ষাট হাজার বছর রাজত্বের বর পেল, আর সেই বরে ত্রিভুবন দখল করল। তার রাজ্যে আনন্দ শুকিয়ে গেল, রস শুকিয়ে গেল, প্রেম শুকিয়ে গেল। মানুষ বেঁচে রইল, বাঁচার স্বাদ রইল না।
দেবতারা তখন মহাযজ্ঞ করলেন — চিদগ্নিকুণ্ড, চৈতন্যের আগুনের কুণ্ড। সেই আগুন থেকে উঠে এলেন এক দেবী। ষোড়শী কিশোরী, উদীয়মান সূর্যের মতো রক্তাভ, পরনে রাজরাজেশ্বরীর সাজ। নাম ললিতা ত্রিপুরসুন্দরী।
তিনি যুদ্ধে গেলেন শ্রীচক্ররথে চড়ে, সঙ্গে সহস্র শক্তিসেনা — মন্ত্রিণী শ্যামলা আর দণ্ডনাথা বারাহী তাঁর দুই সেনাপতি। যুদ্ধ চলল বহুদিন। শেষে কামেশ্বরাস্ত্রে ভণ্ডাসুর ভস্ম হল।
কিন্তু কাহিনীর সবচেয়ে সুন্দর অংশ শেষে। জিতে উঠে দেবী প্রথম যে কাজটি করলেন, তা হল — কামদেবকে বাঁচিয়ে তুললেন। রতিকে স্বামী ফিরিয়ে দিলেন। কারণ তিনি কামের শত্রু নন, তিনি কামের অধীশ্বরী। তাঁর হাতে তাই আখের ধনু আর পাঁচটি ফুলের বাণ — ধনু মন, পাঁচ বাণ পাঁচ ইন্দ্রিয়ের বিষয়। মারা নয়, বশে রাখা।
ভুবনেশ্বরী
আকাশ — যেখান থেকে সব শুরু
ভুবনেশ্বরীর কোনও অসুরবধের কাহিনী নেই। এটি অভাব নয়, এটিই তাঁর পরিচয়। তিনি যুদ্ধের দেবী নন, তিনি জায়গার দেবী — যে জায়গায় যুদ্ধটা হতে পারে।
দেবীভাগবত বলে, সৃষ্টির আগে ছিল কেবল চৈতন্য। না আলো, না অন্ধকার, না সময়, না দিক। সেই চৈতন্যের মধ্যে একটি ইচ্ছা জাগল — ‘আমি বহু হব।’ সেই ইচ্ছাই মহামায়া, তিনিই ভুবনেশ্বরী। তিনি স্থান রচনা করলেন — আকাশ — আর সেই আকাশে চতুর্দশ ভুবন বসল।
তাই বলা হয়, আকাশ তাঁর উদর, নক্ষত্র তাঁর অলংকার, সমুদ্র তাঁর বস্ত্র। জগৎ তাঁর সৃষ্টি নয় — জগৎ তাঁর শরীর।
মণিদ্বীপে তিন দেবতা
একবার ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব — তিনজনেই নিজের নিজের কাজ নিয়ে একটু আত্মপ্রসাদে ছিলেন। কে বড়, এ নিয়ে কথাও চলছিল। ব্রহ্মা বলেন, আমি না গড়লে কিছুই নেই। বিষ্ণু বলেন, আমি না রাখলে সব ভেঙে পড়ে। শিব বলেন, আমি না মুছলে নতুন কিছু হবেই না।
হঠাৎ এক আলোর রথ এসে তিনজনকে তুলে নিয়ে গেল। পৌঁছল মণিদ্বীপে। সেখানে রত্নসিংহাসনে বসে আছেন এক দেবী, চারদিকে অসংখ্য শক্তি।
তিনজন নিজেদের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, তাঁরাও নারীমূর্তি পেয়েছেন। দেবী মৃদু হেসে বললেন, ‘তোমরা যে কাজ করো, সে শক্তি আমার। আমি সরে দাঁড়ালে সৃষ্টিও নেই, পালনও নেই, সংহারও নেই।’
ফিরে এসে তিনজনেই জানলেন, তাঁরা কর্তা নন, যন্ত্র। জগদ্ধাত্রীর কাহিনীতেও ঠিক এই শিক্ষাই ফিরে আসে — শুধু সেখানে তৃণখণ্ড দিয়ে।
ভৈরবী
ক্ষয়ের শক্তি
ভৈরবীর আবির্ভাব কোনও একটি যুদ্ধের দিনে নয়। তন্ত্র বলে, যেদিন কাল নিজের কাজ শুরু করলেন — অর্থাৎ যেদিন থেকে সৃষ্টি ক্ষয় হতে লাগল — সেদিনই সেই ক্ষয়ের শক্তি রূপে ভৈরবী প্রকট হলেন। তাই তিনি কালভৈরবী, মহাকালের সঙ্গিনী।
চণ্ডীতে আবার অন্য কথা। শুম্ভ-নিশুম্ভের সেনার সঙ্গে যুদ্ধে দেবীর ক্রোধ থেকে যে রক্তবর্ণা শক্তি বেরিয়ে আসেন, তিনিই ভৈরবী। অসুরের রক্ত পান করে তাঁর সারা দেহ রক্তবর্ণ হয়ে ওঠে — জবাফুলের মতো।
কিন্তু তাঁর হাতে খড়্গ নয়, হাতে জপমালা আর পুঁথি। এইটুকুতেই তাঁকে চেনা যায়। তাঁর ক্ষয় ধ্বংস নয়, তপস্যা। সোনা গলানোর আগুনের মতো — যা পোড়ে তা ময়লা, যা থাকে তা সোনা।
ছিন্নমস্তা
মন্দাকিনীর ঘাটে
একদিন দেবী পার্বতী তাঁর দুই সখী জয়া ও বিজয়াকে নিয়ে মন্দাকিনী নদীতে স্নান করতে গিয়েছিলেন। তন্ত্রে এই দুই সখীর নাম ডাকিনী আর বর্ণিনী।
স্নান সেরে দেবী পরম আনন্দে ছিলেন। সেই আনন্দের তাপে তাঁর গায়ের রং কালো হয়ে গিয়েছিল। তিনি ধীরে ধীরে ঘাটের দিকে উঠছেন।
দুই সখী পিছনে। তাদের ভীষণ খিদে পেয়েছে। তারা বলল, ‘মা, খিদে পেয়েছে, কিছু খেতে দাও।’ দেবী বললেন, ‘একটু অপেক্ষা করো, ঘরে গিয়ে দেব।’
কিছুটা পথ যেতে না যেতেই তারা আবার বলল, ‘মা, আর পারছি না।’ দেবী আবার বললেন, ‘ধৈর্য ধরো।’ তৃতীয়বার তারা বলল — আর এবার যে কথাটি বলল, সেটিই কাহিনীর মোড় ঘুরিয়ে দিল: ‘মা তো ডাকলেই সন্তানকে খেতে দেন — তুমি এখন দিচ্ছ না কেন? তুমি কি সত্যিই মা?’
দেবী দাঁড়িয়ে পড়লেন। তারপর হাসলেন। নিজের খড়্গ তুলে নিলেন, আর এক কোপে নিজের মাথাটাই কেটে ফেললেন।
কাটা মাথা বাঁ হাতে এসে পড়ল — পড়ল না, যেন ধরা দিল। গলা থেকে ছিটকে উঠল তিনটি রক্তের ধারা। ডান দিকেরটি গিয়ে পড়ল এক সখীর মুখে, বাঁ দিকেরটি অন্য সখীর মুখে। আর মাঝেরটি — সেটি গিয়ে পড়ল দেবীর নিজের কাটা মাথার মুখে। তিনি নিজের রক্ত নিজে পান করলেন।
দুই সখীর খিদে মিটল। এই রূপেই তিনি ছিন্নমস্তা।
ভয়ংকর ছবি, কিন্তু তন্ত্রের ব্যাখ্যাটি অন্যরকম। তিনটি ধারা তিনটি নাড়ি — ইড়া, পিঙ্গলা, সুষুম্না। দুই সখী দুই পাশের নাড়ি; তারা পান করছে মানে প্রাণ চলছে। মাঝের ধারা দেবী নিজে পান করছেন — শক্তি বাইরে না গিয়ে নিজের মধ্যেই ফিরছে। আর মাথা কাটা মানে মৃত্যু নয়, ‘আমি’-বোধের ছেদ। পায়ের নীচে কামদেব ও রতি — কামকে তিনি মারেননি, তার উপরে দাঁড়িয়েছেন।
আর সবচেয়ে সোজা পাঠটি এই: মা শেষ পর্যন্ত নিজেকেই দিয়ে দেন। সন্তান যখন বলে ‘তুমি সত্যিই মা কি না’, মা প্রমাণ চান না — মাথা কেটে দেন।
ধূমাবতী
যে খিদে স্বামীকেও ছাড়েনি
কাহিনীটি ছোট, আর ভয়ানক রকমের সোজা।
একদিন সতী শিবের সঙ্গে ছিলেন, নির্জন জায়গায়। তাঁর ভীষণ খিদে পেল। তিনি বললেন, ‘আমাকে কিছু খেতে দাও।’ শিব ধ্যানে বসেছেন; বললেন, ‘একটু অপেক্ষা করো।’
সতী আবার বললেন। শিব আবার বললেন, ‘দাঁড়াও।’ তৃতীয়বার সতী বললেন, ‘আমি আর পারছি না।’ শিব তখনও চোখ খুললেন না।
তখন সতী বললেন, ‘তবে তোমাকেই খাই’ — আর শিবকে গিলে ফেললেন।
সঙ্গে সঙ্গে তাঁর শরীর থেকে ধোঁয়া বেরোতে লাগল। কারণ যিনি তাঁর ভিতরে, তিনি সমস্ত বিষের ধারক; তাঁকে গিললে ধোঁয়া না বেরিয়ে উপায় নেই।
ভিতর থেকে শিব বললেন, ‘আমাকে ছেড়ে দাও।’ সতী ছাড়লেন। শিব বেরিয়ে এসে বললেন, ‘তুমি স্বামীকে গ্রাস করেছ। আজ থেকে তোমার কোনও স্বামী নেই। তুমি বিধবা রূপে, এই ধোঁয়ার আবরণেই থাকবে। তোমার নাম হবে ধূমাবতী।’
তাই দশমহাবিদ্যার একমাত্র এই রূপটির সঙ্গে কোনও শিব নেই। তিনি একা। তিনি কাকের রথে চড়েন, হাতে কুলো, পরনে ময়লা কাপড়, দাঁত পড়ে গেছে, চোখ কোটরে। তিনি সেই মুহূর্তের দেবী, যখন মানুষের সব চলে যায়।
সাধকেরা বলেন, তাঁকে অশুভ বলা ভুল। তাঁর হাতে অস্ত্র নেই, কুলো আছে। কুলো দিয়ে চাল ঝাড়া হয় — ভালোটা থেকে যায়, খোসা উড়ে যায়। তিনি দেন না, কাড়েন; আর যা কাড়েন তা খোসা। জীবনে যেদিন আঁকড়ে ধরার কিছু থাকে না, সেদিনটাই তাঁর দর্শন।
কেউ কেউ বলেন, সমুদ্রমন্থনে লক্ষ্মীর আগে উঠে এসেছিলেন জ্যেষ্ঠা বা অলক্ষ্মী — তিনিই ধূমাবতী। লক্ষ্মী ও ধূমাবতী তাই দুই বোন, এক মুদ্রার দুই পিঠ।
বগলামুখী
হরিদ্রা সরোবর — যেদিন ঝড় থেমে গেল
সত্যযুগের কথা। হঠাৎ এক প্রলয়ঝড় উঠল — এমন ঝড়, যা পাহাড় উপড়ে ফেলে, সমুদ্র তুলে আছড়ে ফেলে। সৃষ্টি উড়ে যাওয়ার উপক্রম।
দেবতারা ভয় পেয়ে সৌরাষ্ট্রে হরিদ্রা সরোবরের তীরে গেলেন — যে সরোবরের জল হলুদ। সেখানে বসে তাঁরা মহাশক্তির স্তব করলেন।
সেই হলুদ জল থেকে উঠে এলেন এক দেবী — সোনার মতো গায়ের রং, হলুদ বসন, সোনার আসন। তিনি শুধু হাত তুললেন। ঝড় থেমে গেল। শুধু থামল না — স্থির হয়ে গেল, যেন কেউ ছবি তুলে রেখেছে।
এই থামিয়ে দেওয়ার নাম স্তম্ভন, আর এই শক্তির নাম বগলামুখী।
জিহ্বা যিনি ধরে রাখেন
আর একটি কাহিনী বলে, মদন নামে এক অসুর বর পেয়েছিল — সে যা বলবে, তাই সত্যি হবে। ভয়ংকর বর। সে যাকে বলত ‘মরে যা’, সে মরত।
দেবী তাকে মারতে গেলেন না। গিয়ে তার জিহ্বাটা টেনে ধরলেন। কথা বন্ধ, বরও শেষ।
তাই প্রতিমায় তিনি এক হাতে মুগুর তুলেছেন, আর এক হাতে শত্রুর জিহ্বা ধরে আছেন। ‘বগলা’ শব্দটি এসেছে ‘বল্গা’ থেকে — ঘোড়ার লাগাম। যিনি লাগাম ধরেন, তিনিই বগলামুখী।
গুরুরা একটি কথা বারবার বলেন। এই মন্ত্র শত্রুর বাক্ স্তম্ভনের — কিন্তু সবচেয়ে বড় শত্রু ভিতরে। যে মন সারাক্ষণ বকে চলেছে, যে জিহ্বা না ভেবে কথা বলে, আগে তাকে থামাতে হয়। অন্যের ক্ষতির জন্য যে এই মন্ত্র ধরে, শাস্ত্র বলে, স্তম্ভন তার নিজের উপরেই ফেরে।
মাতঙ্গী
উচ্ছিষ্ট থেকে জন্ম
শিব ও পার্বতী একসঙ্গে আহার করছিলেন। খেতে খেতে কিছু অন্ন মাটিতে পড়ে গেল।
সেই পড়ে-যাওয়া, এঁটো অন্ন থেকে উঠে এলেন এক শ্যামবর্ণা কন্যা। উঠেই তিনি দুজনের কাছে হাত পাতলেন — ‘আমাকে খেতে দাও।’
শিব হেসে বললেন, ‘তুমি উচ্ছিষ্টেই তৃপ্তা। তাই আজ থেকে তোমার নাম উচ্ছিষ্টচাণ্ডালিনী। যারা এঁটো নিবেদন করে ডাকবে, তুমি তাদের কাছেই যাবে।’
এখানেই তাঁর গোটা তত্ত্ব। সব দেবতার পূজায় শুদ্ধি লাগে — স্নান, শুদ্ধ বস্ত্র, অস্পৃষ্ট নৈবেদ্য। মাতঙ্গীর পূজায় উল্টো। তাঁর কাছে উঁচু-নিচু, শুদ্ধ-অশুদ্ধের ভেদ নেই। সমাজ যাদের দূরে সরিয়ে রাখে, তিনি তাদেরই দেবী।
অন্যত্র বলা হয়, মতঙ্গ মুনির তপস্যায় তুষ্ট হয়ে ত্রিপুরসুন্দরীর চোখ থেকে এক শ্যামবর্ণা দেবী বেরিয়ে আসেন — তিনিই রাজমাতঙ্গী, মতঙ্গের কন্যা বলে মাতঙ্গী।
তাঁর হাতে বীণা, কাঁধে তোতাপাখি। তিনি তন্ত্রের সরস্বতী — বাক্, সঙ্গীত, কবিতা, শিল্প সব তাঁর। কিন্তু সরস্বতীর শুভ্রতা নয়, তাঁর রং শ্যাম।
কমলা
সমুদ্র থেকে শ্রী
মন্থন চলছে। হলাহল উঠে গেছে, শিব তা পান করেছেন। তারপর একে একে উঠে এল চন্দ্র, কামধেনু, কল্পবৃক্ষ, ঐরাবত, উচ্চৈঃশ্রবা, পারিজাত।
তারপর জল দুভাগ হয়ে গেল। উঠে এলেন এক দেবী, পদ্মের উপরে দাঁড়িয়ে, হাতে পদ্ম, গায়ে সোনার আভা। ত্রিভুবন স্তব্ধ।
সমুদ্র নিজে উঠে এসে তাঁকে মালা পরালেন। নদীরা জল আনল। চারটি দিগ্গজ শুঁড়ে সোনার কলসি তুলে তাঁকে অভিষেক করাল। বিশ্বকর্মা অলংকার গড়লেন।
দেবী চোখ তুলে সভা দেখলেন। দেবতা আছেন, অসুর আছেন, ঋষি আছেন। তিনি হেঁটে গিয়ে বিষ্ণুর গলায় বরমালা দিলেন, আর তাঁর বক্ষে স্থান নিলেন। তিনি শ্রী — সৌন্দর্য, সম্পদ, সৌভাগ্য; আর আসন পদ্ম বলে নাম কমলা।
সাধকেরা একটা সতর্কবাণী দেন। লক্ষ্মী চঞ্চলা — তিনি এক জায়গায় থাকেন না। অধর্মের পথে যে ধন আসে, তা শ্রী নয়, আর তা টেকেও না। কমলারূপে তাঁকে স্থির করা যায়, কারণ এই রূপে তিনি মহাবিদ্যা — নিছক ধনদাত্রী নন।
দুর্গা
মহিষাসুর ও দেবতাদের তেজ
মহিষাসুর ব্রহ্মার তপস্যা করে বর চেয়েছিল — সে যেন অমর হয়। ব্রহ্মা বললেন, ‘অমরত্ব হয় না, অন্য কিছু চাও।’ মহিষ তখন চালাকি করল: ‘তবে এমন হোক, কোনও পুরুষ যেন আমাকে মারতে না পারে।’ সে ভেবেছিল, নারীকে ভয় কী।
বর পেয়েই সে স্বর্গ আক্রমণ করল। একশো বছর দেবাসুরের যুদ্ধ চলল; শেষে ইন্দ্র হারলেন, দেবতারা স্বর্গছাড়া হয়ে মর্ত্যে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন।
তাঁরা গেলেন ব্রহ্মা-বিষ্ণু-শিবের কাছে। শুনে তাঁদের মুখ ক্রোধে লাল হয়ে উঠল, আর সেই ক্রোধ থেকে বেরিয়ে এল তেজ — আগুনের মতো, কিন্তু আগুন নয়। একে একে সব দেবতার শরীর থেকে তেজ বেরোতে লাগল, আর সব মিলে এক পাহাড়ের মতো জ্যোতি তৈরি হল।
সেই জ্যোতি ঘনিয়ে এসে এক নারীমূর্তি হল। শিবের তেজে তাঁর মুখ, যমের তেজে চুল, বিষ্ণুর তেজে বাহু, চন্দ্রের তেজে স্তন, ইন্দ্রের তেজে কটি, ব্রহ্মার তেজে পা, সূর্যের তেজে আঙুল। প্রতিটি অঙ্গ এক-একজন দেবতার দান।
তারপর অস্ত্র। শিব দিলেন ত্রিশূল, বিষ্ণু চক্র, বরুণ শঙ্খ, অগ্নি শক্তি, বায়ু ধনুক-বাণ, ইন্দ্র বজ্র, যম দণ্ড, ব্রহ্মা কমণ্ডলু, বিশ্বকর্মা কুঠার। হিমালয় দিলেন সিংহ। সমুদ্র দিলেন হার ও বস্ত্র।
দেবী তখন এমন এক অট্টহাস্য করলেন যে আকাশ কেঁপে উঠল, সমুদ্র উথলে উঠল, পাহাড় নড়ে গেল। মহিষাসুর সেই শব্দ শুনে বেরিয়ে এল।
লোকবিশ্বাসে যুদ্ধ চলেছিল নয় দিন। মহিষ রূপ বদলাতে লাগল — কখনও মোষ, কখনও সিংহ, কখনও হাতি, কখনও মানুষ। দশমীর দিন, যখন সে মোষের দেহ থেকে মানুষের রূপে বেরিয়ে আসছে, ঠিক সেই আধা-মুহূর্তে দেবী তার বুকে ত্রিশূল বসালেন। তাই প্রতিমায় মহিষের কাটা ঘাড় থেকে অসুর বেরিয়ে আসছে — ওইটেই সেই মুহূর্ত।
আর ‘কোনও পুরুষ মারতে পারবে না’ — বরটি অক্ষরে অক্ষরে রক্ষা পেল।
অকালবোধন — রাম যেদিন অসময়ে ডাকলেন
দেবীর পূজার শাস্ত্রসম্মত সময় ছিল বসন্তকাল, চৈত্র মাস — বাসন্তী পূজা। পুরাণ বলে, রাজা সুরথ প্রথম এই পূজা করেছিলেন।
লঙ্কা আক্রমণের আগে রামচন্দ্র বুঝলেন, শক্তির কৃপা ছাড়া এ যুদ্ধ জেতা যাবে না। কিন্তু তখন শরৎকাল — দক্ষিণায়ন, দেবতাদের রাত্রি। ঘুমন্ত দেবতাকে ডাকা হয় না।
ব্রহ্মা বললেন, ‘ডাকো। মা ঘুম ভাঙলে রাগ করবেন না, কারণ যে ডাকছে সে সন্তান।’ অসময়ে জাগানো বলে এর নাম অকালবোধন।
পূজার জন্য লাগল একশো আটটি নীলপদ্ম। হনুমান দেশ-বিদেশ ঘুরে জোগাড় করে আনলেন। পূজা শুরু হল। অঞ্জলি দিতে দিতে রাম গুনলেন — একটি কম। একশো সাত।
চারদিকে খোঁজ পড়ল, কোথাও নেই। রাম তখন চুপ করে বসে রইলেন। তারপর মনে পড়ল, কবিরা তাঁর চোখকে বলেন ‘রাজীবলোচন’ — পদ্মের মতো চোখ। তিনি বললেন, ‘তবে এই একটি পদ্ম আমিই দিই।’
তূণ থেকে বাণ বার করে নিজের চোখে ঠেকাতে যাবেন — সেই মুহূর্তে দেবী প্রকট হয়ে হাত ধরে ফেললেন। বললেন, ‘আমি তুষ্ট। আমি তো এই একটা জিনিসই চেয়েছিলাম — যে নিজেকে দিতে পারে, তাকেই আমি ধরা দিই।’
বাঙালির শরৎকালের দুর্গাপূজা ওই দিনটিরই উত্তরাধিকার।
আগমনী — মেয়ে ঘরে আসছে
বাংলার নিজের কাহিনীটি কিন্তু যুদ্ধের নয়। এখানে দুর্গা দেবী নন, মেয়ে। গিরিরাজ হিমালয়ের মেয়ে উমা, বিয়ে হয়েছে কৈলাসে।
মেনকা স্বপ্ন দেখেন। দেখেন, উমা এসে দাঁড়িয়েছে — শুকনো মুখ, রুক্ষ চুল, গায়ে গয়না নেই। মা জিজ্ঞাসা করলে মেয়ে কিছু বলে না, শুধু কাঁদে।
ঘুম ভেঙে মেনকা গিরিরাজকে ধরেন — ‘মেয়ে আমার খেতে পায় না, পরনে বাঘছাল, স্বামী নেশা করে ভিক্ষে করে বেড়ায়। তুমি এখনই যাও, উমাকে নিয়ে এসো।’ গিরিরাজ বোঝাতে যান, মেনকা শোনেন না। শেষে তিনি কৈলাসে রওনা দেন।
সপ্তমীতে মেয়ে আসে। তিনদিন বাপের বাড়ি — কত আদর, কত রান্না, কত কথা। তারপর দশমী।
দশমীর সকালে মেনকা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বলেন, ‘আর পাঠাব না।’ কিন্তু পাঠাতে হয়। বরণ হয়, সিঁদুর পরানো হয়, মিষ্টি মুখে দেওয়া হয়, আর মেয়ে চলে যায়।
এই কারণেই বাঙালির বিজয়া দশমী জয়ের দিন কম, বিদায়ের দিন বেশি। সারা দেশ ওই দিনে অসুরবধের উৎসব করে; বাংলা কাঁদে। যে জাতি দেবীকে মেয়ে বানিয়ে ফেলেছে, তার আর উপায় কী।
জগদ্ধাত্রী
তৃণখণ্ড — যেদিন দেবতাদের অহংকার ভাঙল
কেনোপনিষদের কাহিনী। দেবাসুর যুদ্ধে দেবতারা জিতেছেন। জিতে তাঁরা উৎসব করছেন, আর ক্রমে একটা কথা ছড়িয়ে পড়ছে — ‘আমরা জিতেছি।’
অগ্নি বুক ফুলিয়ে বলছেন, ‘আমি না থাকলে কী হত!’ বায়ু বলছেন, ‘আমিই তো উড়িয়ে দিয়েছি ওদের।’ ইন্দ্র বলছেন, ‘আমার বজ্র।’
ঠিক তখন সভার সামনে এসে দাঁড়াল এক জ্যোতির্ময় মূর্তি — এক যক্ষ। কেউ চিনতে পারল না। কী, কে, কোথা থেকে — কিছুই বোঝা যায় না।
দেবতারা অগ্নিকে পাঠালেন। অগ্নি গিয়ে দাঁড়ালেন। যক্ষ জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি কে?’ অগ্নি বললেন, ‘আমি জাতবেদা অগ্নি।’ ‘তুমি কী পারো?’ ‘আমি এই গোটা পৃথিবী পুড়িয়ে ছাই করে দিতে পারি।’
যক্ষ সামনে একটা শুকনো ঘাসের টুকরো রেখে বললেন, ‘এটি পোড়াও।’
অগ্নি ঝাঁপিয়ে পড়লেন। সমস্ত শক্তি ঢাললেন। ঘাসটি পুড়লও না। লজ্জায় মুখ নামিয়ে তিনি ফিরে এলেন — ‘ও কে, বুঝতে পারলাম না।’
এবার বায়ু গেলেন। ‘তুমি কী পারো?’ ‘আমি সব উড়িয়ে নিয়ে যেতে পারি।’ ‘তবে এটি ওড়াও।’ বায়ু সর্বশক্তি দিয়ে ঝড় তুললেন। ঘাসটি এক চুলও নড়ল না।
শেষে ইন্দ্র নিজে এগোলেন। তিনি কাছে যেতেই যক্ষ মিলিয়ে গেলেন।
আকাশে সেই জায়গায় দেখা দিলেন এক দেবী — সোনার মতো উজ্জ্বল, উমা হৈমবতী। তিনি বললেন, ‘ওই যক্ষ ব্রহ্ম। তোমরা যে জয় পেয়েছ, সেটি ব্রহ্মেরই জয়। তোমরা উপলক্ষ মাত্র।’
বাংলার জগদ্ধাত্রী এই উমা হৈমবতীরই রূপ। তাঁর সিংহের নীচে যে হাতি — করীন্দ্রাসুর — সে আর কেউ নয়, ওই ‘আমিই করেছি’ বোধটাই। হাতি অহংকারের প্রতীক, আর তাকে পায়ের নীচে রাখাই জগদ্ধাত্রীর কাজ।
কৃষ্ণচন্দ্র ও কার্তিকী নবমী
বাংলায় জগদ্ধাত্রী পূজার প্রচলন নিয়ে যে কথাটি চলে আসছে, সেটি নদিয়ার মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের।
যে গল্পটি চালু আছে তা এই। নবাবের কাছে রাজস্ব বাকি থাকায় মহারাজকে বন্দি করে মুর্শিদাবাদে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই বছর দুর্গাপূজা তিনি করতে পারলেন না। কারাগারে বসে তিনি শুনলেন, দেশে বিসর্জনের বাজনা বাজছে।
মুক্তি পেয়ে নৌকায় ফেরার পথে তিনি দেবীর স্বপ্নাদেশ পান — ‘দুঃখ কোরো না। কার্তিক মাসের শুক্লা নবমীতে আমাকে জগদ্ধাত্রী রূপে পূজা করো, দুর্গাপূজার ফলই পাবে।’
গল্প বলে, সেই থেকে কৃষ্ণনগরে জগদ্ধাত্রী পূজা শুরু। (ইতিহাস কী বলে, তা নীচে ‘জগদ্ধাত্রী কে আনলেন’ কাহিনীতে।) কৃষ্ণনগর থেকে পূজা ছড়াল চন্দননগরে, তারপর রিষড়ায়। চন্দননগরের আলোর সাজ আর শোভাযাত্রা আজ বিশ্ববিখ্যাত — কিন্তু তার গোড়ায় একজন বন্দি মানুষের না-করতে-পারা একটা পূজা।
ভক্তের কথা ও লীলা
যে কাহিনী শুনে লোকে মাকে আপনার বলে চিনেছে — রামকৃষ্ণ, বামাক্ষ্যাপা, রামপ্রসাদ, সারদা মা, আর কত নামগোত্রহীন মানুষ।
মা, তুমি কি সত্যিই আছ?
শ্রীরামকৃষ্ণ · দক্ষিণেশ্বর
দক্ষিণেশ্বরে এসে গদাধর মন্দিরের পূজারি হলেন। কিন্তু পূজা তাঁর হয় না। ফুল তুলতে গিয়ে বসে থাকেন, ভোগ নিবেদন করতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন। সকলে বলাবলি করে, ছেলেটির মাথা খারাপ হয়ে গেছে।
তাঁর প্রশ্নটা ছিল সোজা। পাথরের মূর্তি — একে স্নান করাচ্ছি, কাপড় পরাচ্ছি, খাওয়াচ্ছি। এ যদি সত্যি না হয়, তবে এ তো নিছক অভিনয়। আর যদি সত্যি হয়, তবে কথা বলে না কেন?
দিনের পর দিন তিনি ডাকতে লাগলেন। কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে মুখ ঘষতেন, গাল ছড়ে রক্ত বেরোত। বলতেন, ‘মা, আর একটা দিন চলে গেল। তুমি এলে না।’ রাত হলে জামাকাপড়, পৈতে সব ছুঁড়ে ফেলে দিতেন — ‘এই সব বাঁধন নিয়ে তোমাকে ডাকা যায় না।’
একদিন আর সহ্য হল না। মন্দিরের দেওয়ালে মায়ের খড়্গ ঝোলানো থাকত। তিনি ছুটে গিয়ে সেটি নামালেন। ভাবলেন — এ জীবনে যদি মায়ের দেখা না মেলে, তবে এ জীবন রেখে লাভ নেই।
তারপর যা হল, সে কথা তিনি নিজেই পরে বলেছেন। ঘর, দরজা, মন্দির, সব একসঙ্গে মুছে গেল। চারদিকে শুধু অখণ্ড চেতনার সমুদ্র — অসীম, উজ্জ্বল, ঢেউয়ের পর ঢেউ, গর্জন করতে করতে তাঁর দিকে ছুটে আসছে। সেই ঢেউয়ের ভিতর থেকে মা এসে দাঁড়ালেন। তিনি জ্ঞান হারালেন।
এরপর থেকে মা তাঁর কাছে আর মূর্তি রইলেন না। রইলেন ঘরের লোক। তিনি মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করতেন, অভিমান করতেন, রাগ করে ভোগ ফিরিয়ে দিতেন। মা-ও শুনতেন।
বিড়াল আর বিগ্রহ
শ্রীরামকৃষ্ণ · দক্ষিণেশ্বর
মায়ের দর্শনের পর রামকৃষ্ণের পূজা এমন হয়ে দাঁড়াল যে মন্দিরের কর্মচারীরা ঘাবড়ে গেল। তিনি নিজে ভোগ খেয়ে তারপর মাকে দিতেন। নিজে ফুল শুঁকে তারপর চরণে দিতেন।
একদিন পূজা করতে করতে দেখলেন, মন্দিরের একটা বিড়াল এসে ম্যাও ম্যাও করছে। তিনি ভোগের থালা থেকে খাবার তুলে বিড়ালটাকে খাইয়ে দিলেন — মাকে নিবেদন করার আগেই।
খবর গেল রানি রাসমণির জামাই মথুরবাবুর কাছে। তিনি ছুটে এলেন। রামকৃষ্ণ বললেন, ‘আমি দেখলাম মা-ই তো বিড়াল হয়ে এসেছেন। মা খেতে চাইলেন, দিলাম।’
মথুরবাবু কিছু বললেন না। ফিরে গিয়ে সকলকে বলে দিলেন, ‘ওঁকে কিছু বলবে না। ওঁর পূজা আমাদের নিয়মে চলে না।’
ভক্তেরা এই গল্পটি বলেন এক কারণে। শাস্ত্র বলে মায়ের ভোগ আগে। রামকৃষ্ণ শাস্ত্র ভাঙেননি — তিনি শুধু দেখেছিলেন, ক্ষুধার্ত প্রাণীও মা। নিয়মটা তখন আর নিয়ম থাকে না।
বামাক্ষ্যাপা ও মায়ের ভাত
বামাক্ষ্যাপা · তারাপীঠ
তারাপীঠের মহাশ্মশানে থাকতেন বামাচরণ — লোকে বলত বামা ক্ষ্যাপা। ক্ষ্যাপা, কারণ তিনি নিয়ম মানতেন না। কাপড় পরার ঠিক নেই, স্নানের ঠিক নেই, শ্মশানের চিতার পাশে শুয়ে থাকেন।
মন্দিরের সেবাইতরা তাঁকে দুচক্ষে দেখতে পারতেন না।
একদিন দুপুরে মায়ের ভোগ সাজানো হয়েছে। নিবেদন তখনও হয়নি। বামা কোথা থেকে এসে থালা থেকে ভাত তুলে খেতে শুরু করলেন।
সেবাইতরা ছুটে এল। ‘এ কী অনাচার! মায়ের ভোগে হাত!’ তারা তাঁকে মারতে মারতে মন্দির থেকে বার করে দিল। বামা একটাও কথা বললেন না, শুধু শ্মশানের দিকে হাঁটতে হাঁটতে বললেন, ‘মা, তোর ছেলেকে খেতে দিলি না।’
মন্দির তখন নাটোর রাজবাড়ির। সেই রাতে নাটোরের রানি স্বপ্ন দেখলেন — মা তারা এসে দাঁড়িয়েছেন, চোখ লাল। বলছেন, ‘ওরা আমার ছেলেকে মেরেছে। ও আগে খেলে আমি আগেই খাই — ও আমার ছেলে, ও তো আমারই মুখ। কাল থেকে ওকে আগে খাওয়াবি, তারপর আমাকে।’
ঘুম ভেঙে রানি সঙ্গে সঙ্গে লোক পাঠালেন। সেবাইতরা শ্মশান থেকে বামাকে ডেকে আনল, পায়ে ধরে ক্ষমা চাইল। তারপর থেকে তারাপীঠে নিয়ম হল — আগে বামাক্ষ্যাপা, তারপর মা।
বেড়া বেঁধে দিলেন কে
রামপ্রসাদ সেন · হালিশহর
রামপ্রসাদ কেরানির কাজ করতেন কলকাতায়, খাতার পাতায় হিসেবের বদলে গান লিখে ফেলতেন। মালিক দুর্গাচরণ মিত্র খাতা দেখে রাগ করলেন না — পড়ে মুগ্ধ হয়ে গেলেন, আর বললেন, ‘তুমি বাড়ি যাও, গান লেখো। মাইনে চলতে থাকবে।’
হালিশহরে ফিরে তিনি সারাদিন গান বাঁধেন। সংসার চলে কোনওরকমে।
একদিন বাড়ির বেড়া ভেঙে গেছে। রামপ্রসাদ মেয়েকে ডেকে বললেন, ‘ধর তো, বাঁধি।’ মেয়ে ওপাশ থেকে দড়ি এগিয়ে দেয়, তিনি এপাশে বাঁধেন। খানিক পরে মায়ের ডাকে মেয়ে ঘরে চলে গেল; রামপ্রসাদ টেরও পেলেন না। বাঁধতে বাঁধতে তাঁর মনে গান এল, আর তিনি গান ধরলেন।
গান গাইতে গাইতে তিনি সব ভুলে গেলেন। কতক্ষণ কেটেছে জানেন না। গান শেষ হলে দেখেন, বেড়া বাঁধা হয়ে গেছে — নিখুঁতভাবে।
তিনি বললেন, ‘মা, তুই এতক্ষণ ধরে ছিলি?’ ওপাশে তাকিয়ে দেখেন, কেউ নেই। ভিতরে গিয়ে দেখেন, মেয়ে ঘরের কাজে ব্যস্ত — সে অনেকক্ষণ আগেই চলে এসেছে, তারপর আর বেড়ার কাছে যায়নি।
বাংলার ঘরে ঘরে এই গল্পটি বলা হয় এক কারণে: রামপ্রসাদ মাকে দূরের কেউ ভাবতেন না। তাঁর গানে তিনি মাকে বকেন, অভিমান করেন, হিসেব চান, ‘তবিলদারি’ চেয়ে বসেন। মা-ও তেমনি — বেড়া ধরতে এসে যান।
‘কেউ পর নয়’
সারদা দেবী · জয়রামবাটী
শ্রীরামকৃষ্ণের চলে যাওয়ার পর সারদা দেবীর কাছে ভক্তেরা আসতে শুরু করলেন। তিনি রাঁধতেন, খাওয়াতেন, কথা শুনতেন। কেউ দীক্ষা চাইলে দিতেন। গ্রামের লোক তাঁকে ডাকত ‘মা’ বলে।
আমজাদ নামে এক মুসলমান যুবক ছিল সেই অঞ্চলে, যার নামে ডাকাতির অপবাদ ছিল। লোকে তাকে ভয় পেত, এড়িয়ে চলত। মা তাকে ডেকে খেতে দিতেন, নিজে পাশে বসে পাখা করতেন।
একদিন আমজাদ খেয়ে ওঠার পর তার এঁটো জায়গা মা নিজেই পরিষ্কার করতে গেলেন। ভাইঝি নলিনী আপত্তি করলে মা বললেন, ‘শরৎ আমার যেমন ছেলে, আমজাদও আমার তেমনই ছেলে।’ শরৎ মানে স্বামী সারদানন্দ।
জীবনের শেষদিকে, শয্যাশায়ী অবস্থায়, এক ভক্তিমতী মহিলা — অন্নপূর্ণার মা — কেঁদে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘মা, আমাদের কী হবে?’ তিনি যে কথাটি বলেছিলেন, সেটিই তাঁর শেষ উপদেশ হয়ে আছে —
‘যদি শান্তি চাও, মা, কারও দোষ দেখো না। দোষ দেখবে নিজের। জগৎকে আপনার করে নিতে শেখো। কেউ পর নয়, মা, জগৎ তোমার।’
বলিদানের বদলে
প্রচলিত লোককথা · বাংলা
এক গ্রামে কালীপূজায় বলি হত। এক বছর যে ছাগলটি আনা হয়েছিল, সেটি বেঁধে রাখার পর সারা রাত ডেকেছে।
গ্রামের এক বৃদ্ধা সারা রাত ঘুমোতে পারেননি। ভোরবেলা তিনি পূজারিকে গিয়ে বললেন, ‘আমার মনে হচ্ছে মা-ই ডাকছেন।’ পূজারি হেসে উড়িয়ে দিলেন।
বলির সময় খাঁড়া তোলা হয়েছে। ঠিক সেই মুহূর্তে বৃদ্ধা ছুটে এসে ছাগলটাকে জড়িয়ে ধরলেন, আর বললেন, ‘আমাকে কাটো।’
সভা স্তব্ধ। পূজারি খাঁড়া নামিয়ে রাখলেন। সেই বছর থেকে ওই গ্রামে ছাগবলি বন্ধ হয়ে যায়; তার বদলে চালকুমড়ো বলি হয়।
এই গল্পটির বহু চেহারা বাংলার নানা গ্রামে চলে। বলির প্রথা শাস্ত্রে আছে, বহু মন্দিরে আজও চলে — গল্পটি সেই তর্কে যায় না। সে শুধু একটা কথা মনে করিয়ে দেয়: মায়ের কাছে দয়াও এক নৈবেদ্য।
মূর্তি কি পাথর?
স্বামী বিবেকানন্দ · অলওয়ার, ১৮৯১
১৮৯১ সাল। পরিব্রাজক বিবেকানন্দ তখন রাজপুতানার অলওয়ারে। মহারাজা মঙ্গল সিংহ পাশ্চাত্য শিক্ষায় মানুষ; তিনি সোজাসুজি বললেন, ‘মূর্তিপূজায় আমার বিশ্বাস নেই। পাথর, মাটি, ধাতু — এসবের পূজা আমি করতে পারি না। আমার কী গতি হবে?’
স্বামীজি দেওয়ালে টাঙানো মহারাজার একটি ছবি দেখিয়ে দেওয়ানকে বললেন, ‘ছবিটা নামিয়ে আনুন।’ ছবি আনা হল।
‘এর উপর থুতু ফেলুন।’
সভা স্তব্ধ। দেওয়ান এগোলেন না, কেউই এগোলেন না। স্বামীজি বললেন, ‘এ তো কাগজ আর রং মাত্র — মহারাজ তো এর মধ্যে নেই। তবু পারছেন না কেন? কারণ আপনারা জানেন, এটি মহারাজের ছবি। এতে থুতু দিলে মহারাজকেই অপমান করা হয়।’
তারপর মহারাজার দিকে ফিরে বললেন, ‘ভক্তও তেমনি। সে পাথরের পূজা করে না — পাথরের মধ্যে দিয়ে যাঁকে দেখে, তাঁর পূজা করে। কেউ মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে বলে না, “হে পাথর, তোমায় পূজা করি।”’
মহারাজা নত হয়ে স্বীকার করলেন, এভাবে তিনি কখনও ভেবে দেখেননি।
রানি রাসমণির স্বপ্ন
দক্ষিণেশ্বর · ১৮৪৭–১৮৫৫
১৮৪৭ সাল। রানি রাসমণি কাশী যাত্রার আয়োজন করেছেন। নৌকো ঠিক, লোকজন ঠিক, সব গোছানো।
যাত্রার আগের রাতে তিনি স্বপ্ন দেখলেন। মা বলছেন — কাশী যাওয়ার দরকার নেই। গঙ্গার ধারে একটা সুন্দর মন্দির গড়ে আমার মূর্তি বসাও, আর সেখানেই পূজার ব্যবস্থা করো।
তিনি যাত্রা বাতিল করলেন। দক্ষিণেশ্বর গ্রামে জেক হেস্টি নামে এক ইংরেজের কাছ থেকে জমি কিনলেন — জায়গাটার নাম ছিল সাহেবান বাগিচা।
কাজ চলল ১৮৪৭ থেকে ১৮৫৫ পর্যন্ত। খরচ হল নয় লক্ষ টাকা — সেকালের হিসেবে যা প্রায় অবিশ্বাস্য।
১৮৫৫ সালের ৩১ মে, স্নানযাত্রার দিন, মূর্তি প্রতিষ্ঠা হল। নাম রাখা হল শ্রীশ্রীজগদীশ্বরী মহাকালী। লোকে বলে ভবতারিণী। প্রতিষ্ঠার দিন লক্ষাধিক ব্রাহ্মণ এসেছিলেন।
রানি এর ছ’বছর পরে, ১৮৬১-তে, দেহ রাখেন। মন্দিরের খরচ যাতে কোনও দিন না আটকায়, তার জন্য তিনি দিনাজপুরের সম্পত্তি মন্দিরের নামে লিখে দিয়ে গিয়েছিলেন।
যে মন্দিরে দাঁড়িয়ে রামকৃষ্ণের সাধনা, যে মন্দিরের নহবতে সারদা দেবীর ঘর — তার শুরু এক রাতের স্বপ্নে।
যে ব্রাহ্মণ রাজি হলেন
দক্ষিণেশ্বর · ১৮৫৫
মন্দির তৈরি। মূর্তি তৈরি। কিন্তু পূজা করবে কে?
রানি রাসমণি ছিলেন মাহিষ্য — ব্রাহ্মণ নন। সেকালের বিধান অনুসারে অব্রাহ্মণের প্রতিষ্ঠিত মন্দিরে ব্রাহ্মণ পূজা করতে পারেন না, ভোগও গ্রহণ করতে পারেন না। একের পর এক পণ্ডিত মাথা নাড়লেন।
এমন অবস্থায় রাজি হলেন এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ — কামারপুকুরের রামকুমার চট্টোপাধ্যায়। তিনি প্রধান পুরোহিত হলেন।
সঙ্গে এলেন তাঁর ছোট ভাই গদাধর, আর ভাগ্নে হৃদয়। গদাধর প্রথমে পূজায় হাত দিতে চাননি; তিনি বাগানের কাজে, ফুল তোলায় থাকতেন।
১৮৫৬ সালে রামকুমার মারা গেলেন। প্রধান পুরোহিতের আসনে বসলেন সেই ছোট ভাইটি।
গদাধরকে পরে সারা পৃথিবী চিনেছে রামকৃষ্ণ পরমহংস নামে।
একটা সামাজিক বিধান আটকে দাঁড়িয়েছিল। এক জন লোক রাজি হয়েছিলেন বলে বাংলার ধর্মজীবনের গতিটাই বদলে গেল।
শূন্য আসন
ফলহারিণী কালীপূজার রাত · দক্ষিণেশ্বর
পূজার সব আয়োজন হয়ে গেছে। আসন পাতা, ফুল-বেলপাতা সাজানো, নৈবেদ্য রাখা। কেবল আসনটা খালি।
রামকৃষ্ণ স্ত্রীকে ডেকে আনলেন, আর সেই আসনে বসালেন। তারপর ষোড়শী ত্রিপুরসুন্দরী জ্ঞানে পূজা করলেন — মন্ত্র পড়ে, ফুল দিয়ে, সমস্ত উপচারে।
শেষে নিজের সাধনার সমস্ত ফল তিনি সেই পায়ে সমর্পণ করলেন।
শাক্ত শাস্ত্র বলে, নারীমাত্রেই দেবীর অংশ। কথাটা বলা সহজ, শোনাও সহজ। নিজের স্ত্রীকে আসনে বসিয়ে পূজা করা সহজ নয় — কারণ ঘরের মানুষকে দেবতা দেখা সবচেয়ে কঠিন।
তারিখটা নিয়ে দুটো মত আছে, আর দুটোই সম্মানিত সূত্রের। ‘শ্রীশ্রীমায়ের কথা’-য় ৫ জুন ১৮৭২; স্বামী সারদানন্দের লেখা জীবনীতে ২৫ মে ১৮৭৩। কোনটা ঠিক, তার মীমাংসা হয়নি — তাই দুটোই লিখে রাখা হল।
তুমি আমাকে রক্ষা কর?
ক্ষীরভবানী, কাশ্মীর · ১৮৯৮
১৮৯৮ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর। বিবেকানন্দ একা গেলেন কাশ্মীরে ক্ষীরভবানীর মন্দিরে। সাত দিন রইলেন, ক্ষীর নিবেদন করে পূজা করলেন।
মন্দিরটা ভাঙা। বহুকাল আগে আক্রমণে ধ্বংস হয়েছিল, তারপর আর কেউ গড়ে তোলেনি।
ভাঙা পাথরের সামনে বসে তাঁর মনে ক্ষোভ জাগল — ‘মা এখানে কত যুগ ধরে আছেন। মন্দির ভেঙে দিল, অথচ এখানকার লোক কিছুই করল না। আমি যদি সেদিন থাকতাম…’
কথা শেষ হওয়ার আগেই উত্তর এল। যেন কেউ বলছেন — তুমি আমাকে রক্ষা কর, না আমি তোমাকে রক্ষা করি?
প্রশ্নটা তাঁর সমস্ত হিসেব উল্টে দিল। যিনি জগৎ ধারণ করে আছেন, তাঁকে রক্ষা করার কল্পনাটাই অহংকার। রক্ষা করার কথা যে ভাবে, সে নিজেকে বড় ভাবে।
কাশ্মীর থেকে যিনি ফিরলেন, তিনি আর আগের মানুষ নন। যাঁরা দেখেছেন তাঁরা বলেন, এরপর তিনি সর্বত্র মাকে দেখতেন।
জগদ্ধাত্রী কে আনলেন
কৃষ্ণনগর, শান্তিপুর ও দিগনগর
প্রচলিত গল্পটা এইরকম। নদিয়ার মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রকে নবাব আলিবর্দি খাঁ বন্দি করেছিলেন। বন্দিদশায় দুর্গাপূজা হাতছাড়া হয়ে গেল। বিজয়া দশমীর দিন তিনি মুক্তি পান, আর সেই সময় জগদ্ধাত্রীর স্বপ্নাদেশ পান। তারপর থেকেই তিনি নিজের রাজ্যে জগদ্ধাত্রী পূজার প্রচলন করেন।
গল্পটা সুন্দর, আর নদিয়ায় সকলেই জানে। কিন্তু এটা কিংবদন্তি, ইতিহাস নয়।
কারণ কৃষ্ণচন্দ্রের অনেক আগে থেকেই নদিয়ায় জগদ্ধাত্রীকে লোকে চিনত। শান্তিপুরের জলেশ্বর মন্দির (১৬৬৫) আর দিগনগরের রাঘবেশ্বর মন্দিরের (১৬৬৯) দেওয়ালের টেরাকোটায় তাঁর মূর্তি আছে — কৃষ্ণচন্দ্রের জন্মেরও আগের কাজ।
অর্থাৎ পূজা আগেই ছিল; কৃষ্ণচন্দ্র তাকে রাজকীয় চেহারা দিয়েছিলেন। রাজার নামে গল্প জমে, গ্রামের মন্দিরের নামে জমে না।
তত্ত্বটা এসেছে কেনোপনিষদ থেকে। দেবতারা অসুর জয় করে অহংকারী হয়েছিলেন। তখন এক যক্ষ এসে সামনে একটা তৃণ রাখলেন। অগ্নি তাকে পোড়াতে পারলেন না, বায়ু উড়িয়ে নিতে পারলেন না।
শিক্ষাটা সোজা — শক্তি দেবতার নিজের নয়, শক্তি দেবীর। জগদ্ধাত্রী সেই শিক্ষারই মূর্তি; তাই তাঁর পায়ের নীচে করীন্দ্রাসুর — হাতির রূপে অহংকার।