ভৈরবী
পঞ্চম মহাবিদ্যা · ত্রিপুরাভৈরবী · কালভৈরবী · শুভঙ্করী
পরিচয়
ভৈরবী ভৈরবের শক্তি। ‘ভৈরব’ অর্থে যিনি ভয় জন্মান, আবার যিনি ভয় হইতে রক্ষা করেন। ভৈরবী সেই সংহারশক্তির নারীরূপ — কিন্তু তাঁহার সংহার ধ্বংস নহে, ক্ষয়। প্রতিদিন আমরা যে ক্ষয়ের পথে অগ্রসর হই, তাহাই তাঁহার কর্ম।
রূপ — সহস্র সূর্যের ন্যায় রক্তাভ দেহ, রক্তবস্ত্র, মস্তকে চন্দ্রকলা, কণ্ঠে মুণ্ডমালা, স্তনে রক্তচিহ্ন। চারি হস্তে জপমালা ও পুস্তক (জ্ঞান), বর ও অভয়।
এক হস্তে মালা, অপর হস্তে পুস্তক — উভয়ই তপস্যার চিহ্ন। সেই হেতু ভৈরবীকে তপস্বিনীদের দেবী বলা হয়।
উৎপত্তির কাহিনী
ভৈরবীর আবির্ভাব মহাকালের সহিত যুক্ত। কাল যখন আপন কর্ম আরম্ভ করিলেন — অর্থাৎ যখন সৃষ্টির ক্ষয় আরম্ভ হইল — তখন সেই ক্ষয়ের শক্তিরূপে ভৈরবী প্রকট হইলেন। সেই হেতু তাঁহাকে কালভৈরবী বলা হয়।
আর এক ধারা বলে, দেবী দুর্গা যখন শুম্ভ-নিশুম্ভের সেনার সহিত যুদ্ধে অবতীর্ণা হন, তখন তাঁহার ক্রোধ হইতে যে রক্তবর্ণা শক্তি নির্গতা হইলেন, তিনিই ভৈরবী। অসুরগণের রুধির পান করিয়া তাঁহার দেহ রক্তবর্ণ হইয়া যায়।
তন্ত্রে ভৈরবী মূলতঃ কুণ্ডলিনীর শক্তি — যে তাপে সাধকের অন্তরের অশুদ্ধি দগ্ধ হয়। সেই হেতু তাঁহার সাধনা কঠিন, আর তাঁহার নামের সহিত ‘তপস্’ শব্দটি জড়িত।
মন্ত্র
মন্ত্রের নাম (একাক্ষর, ত্র্যক্ষর …) আসে তাহার অক্ষরসংখ্যা হইতে; শাস্ত্রে সেই গণনায় আদির প্রণব (ওঁ) ধরা হয় না। বন্ধনীতে প্রণবসহ সমস্ত অক্ষরের সংখ্যা দেওয়া হইল।
ত্র্যক্ষর (ওঁ-সহ ৪ অক্ষর)
ত্রিপুরাভৈরবী — বর্ণ ভাঙিয়া লেখা রূপ (পাঠান্তর) (১১ অক্ষর)
মূলমন্ত্র (ওঁ-সহ ৯ অক্ষর)
ধ্যানমন্ত্র
বঙ্গানুবাদ
- উদীয়মান সহস্র সূর্যের ন্যায় তাঁহার দীপ্তি, কণ্ঠে মুণ্ডমালা।
- পরনে রক্তবস্ত্র, নয়ন দুইটি রক্তপদ্মের ন্যায়।
- এক হাতে বর, এক হাতে অভয়, এক হাতে জপমালা।
- অন্য হাতে পুস্তক; তিনি ত্রিনয়না, মস্তকে চন্দ্রকলা।
শব্দে-শব্দে অর্থ
| শব্দ | অর্থ |
|---|---|
| উদ্যদ্ভানুসহস্রাভাম্ | উদীয়মান সহস্র সূর্যের ন্যায় দীপ্তিমতী |
| শিরোমালা | মুণ্ডমালা |
| বিভূষিতাম্ | বিভূষিতা |
| রক্তাম্বরধরাম্ | রক্তবস্ত্রধারিণী |
| দেবীম্ | দেবীকে |
| রক্তপঙ্কজ | রক্তপদ্ম |
| লোচনাম্ | নয়নবিশিষ্টা |
| বরাভয়করাম্ | যাঁহার হস্তে বর ও অভয়মুদ্রা |
| জপমালা | জপের মালা |
| অক্ষসূত্রিণীম্ | রুদ্রাক্ষের মালা ধারণকারিণী |
| পুস্তকম্ | গ্রন্থ |
| দধতীম্ | ধারণ করিয়া আছেন যিনি |
| ত্রিনেত্রাম্ | ত্রিনয়না |
| চন্দ্রশেখরাম্ | মস্তকে চন্দ্রকলাধারিণী |
প্রণাম মন্ত্র
বঙ্গানুবাদ
হে ভৈরবী, হে ভৈরবের আরাধ্যা, হে ভবসাগরতারিণী! ভবপাশ হইতে মুক্তির জন্য, হে ভৈরবী, তোমাকে প্রণাম করি।
গায়ত্রী
বঙ্গানুবাদ
ত্রিপুরাকে জানি, মহাভৈরবীকে ধ্যান করি — সেই দেবী আমাদের প্রেরণা দিন।
স্তোত্র — চণ্ডী (দেবীমাহাত্ম্য) — অপরাজিতা স্তুতির সূচনা
বাংলা অর্থ
- দেবীকে প্রণাম, মহাদেবীকে প্রণাম, কল্যাণময়ী শিবাকে সর্বদা প্রণাম।
- প্রকৃতিকে প্রণাম, ভদ্রাকে প্রণাম — সংযত হইয়া আমরা তাঁহার নিকট প্রণত হইয়াছি।
- রৌদ্রাকে প্রণাম, নিত্যাকে প্রণাম, গৌরীকে ও ধাত্রীকে পুনঃপুনঃ প্রণাম।
- যিনি জ্যোৎস্না, যিনি চন্দ্ররূপিণী, যিনি সুখস্বরূপা — তাঁহাকে সর্বদা প্রণাম।
শ্রীত্রিপুরার্ণবোক্তবর্গান্তস্তোত্রম্ — সম্পূর্ণ পাঠ
১
ক্ষ্মা (ক্ষিতি), অম্বু (জল), অগ্নি, ঈরণ (বায়ু), খ (আকাশ), অর্ক (সূর্য), ইন্দু (চন্দ্র) ও যষ্টা (যজমান) — শিবের এই অষ্টমূর্তির অক্ষরসমূহে যিনি প্রকাশিতা; মাতৃকারূপে ভৈরবের সহিত যুক্তা — সেই দেবী ত্রিপুরাভৈরবীকে আমি বন্দনা করি।
২
ক-আদি বর্ণবর্গের অষ্টক-আকারে যিনি সমস্ত অষ্টকেরই বিগ্রহ, যিনি অষ্টশক্তিতে আবৃতা — সেই দেবী ত্রিপুরাভৈরবীকে আমি বন্দনা করি।
৩
ষোড়শ স্বরের এবং পর ও অপর ভেদে ছত্রিশ তত্ত্বের মধ্যে যিনি বিরাজমানা — সেই ষট্ত্রিংশত্তত্ত্বগা দেবী ত্রিপুরাভৈরবীকে আমি বন্দনা করি।
৪
ছত্রিশ তত্ত্বে সংস্থাপিত শিব ও চন্দ্রকলাসমূহের মধ্যেও যিনি অন্তর্গতা, ক-আদি তত্ত্বের অন্তরে যিনি বিরাজমানা — সেই দেবী ত্রিপুরাভৈরবীকে আমি বন্দনা করি।
৫
‘আ’ ও ‘ঈ’ — মায়ার এই দুই উপাধিতে ও বিচিত্র ইন্দুকলায় যিনি সমন্বিতা, যিনি সর্বাত্মিকা ও পরা — সেই দেবী ত্রিপুরাভৈরবীকে আমি বন্দনা করি।
৬
ষড়ধ্বের পিণ্ডযোনিতে যিনি অবস্থিতা, যিনি মণ্ডলত্রয়ের কুণ্ডলিনী, যিনি লিঙ্গত্রয় অতিক্রম করিয়া আছেন — সেই দেবী ত্রিপুরাভৈরবীকে আমি বন্দনা করি।
৭
স্বয়ম্ভূর হৃদয়ে যিনি স্থিতা, বাণ-ভ্রূ-কামের অন্তরে ও তাহার অতীতে যিনি বিরাজমানা; বহির্মুখ (প্রাচী) দৃষ্টির বিপরীতে যিনি অন্তর্মুখ চৈতন্য — সেই দেবী ত্রিপুরাভৈরবীকে আমি বন্দনা করি।
৮
অক্ষরের অন্তর্গত অশেষ নাম ও রূপ যাঁহার, যিনি ক্রিয়ার পরা শক্তি, যিনি বিশ্বেশ্বরী — সেই দেবী ত্রিপুরাভৈরবীকে আমি বন্দনা করি।
ফলশ্রুতি
৯
সমাহিতচিত্ত সাধকগণ বর্গের অন্তে এই স্তোত্র পাঠ করিবেন। পাঠকারী সমস্ত কামনা লাভ করে এবং অন্তে সায়ুজ্য প্রাপ্ত হয়।
এইরূপে শ্রীত্রিপুরার্ণবোক্ত বর্গান্তস্তোত্র সম্পূর্ণ হইল।
কয়েকটি শব্দের অর্থ
| শব্দ | অর্থ |
|---|---|
| ক্ষ্মা | পৃথিবী |
| অম্বু | জল |
| ঈরণ | বায়ু |
| অর্ক | সূর্য |
| ইন্দু | চন্দ্র |
| মাতৃকা | বর্ণমালার অধিষ্ঠাত্রী শক্তি |
| কাদিবর্গ | ক-আদি বর্গ; ক হইতে আরম্ভ বর্ণবর্গ |
| অষ্টশক্তি | আট শক্তি |
| ষট্ত্রিংশত্তত্ত্ব | ছত্রিশ তত্ত্ব; শৈব-শাক্ত তত্ত্বক্রম |
| পরাপর | পর ও অপর; উচ্চ ও নিম্ন স্তর |
| চন্দ্রকলা | চাঁদের কলা |
| ষডধ্ব | ষড়ধ্ব; তন্ত্রোক্ত ছয় পথ |
| মণ্ডলত্রয় | তিন মণ্ডল |
| কুণ্ডলী | কুণ্ডলিনী |
| লিঙ্গত্রয় | তন্ত্রোক্ত তিন লিঙ্গ |
| প্রত্যক্চিতি | প্রত্যক্চিতি; অন্তর্মুখী চৈতন্য |
| বিশ্বেশ্বরী | বিশ্বের অধীশ্বরী |
| সাযুজ্য | সায়ুজ্য; দেবতার সহিত ঐক্য |
শ্রীভৈরবীকবচম্ — সম্পূর্ণ পাঠ
পাঠকের জন্য টীকা। এই কবচের ফলশ্রুতিতে নর ও পশু বলি দিয়া পূজার কথা আছে। নরবলি বহুকাল আগে পরিত্যক্ত, আর আজ তাহা আইনত গুরুতর অপরাধ; পশুবলিও অনেক জায়গায় নিষিদ্ধ। পাঠটি শাস্ত্রের নথি হিসাবে অবিকল দেওয়া হইল — ইহা কোনও বিধান নহে।
এই পাঠের বঙ্গানুবাদ এখনও লেখা হয় নাই; কেবল মূল সংস্কৃত দেওয়া হইল।
১
২
৩
৪
৫
৬
৭
৮
৯
১০
১১
১২
১৩
১৪
১৫
১৬
১৭
১৮
১৯
২০
২১
২২
২৩
২৪
২৫
২৬
২৭
২৮
২৯
৩০
৩১
৩২
৩৩
৩৪
৩৫
৩৬
৩৭
৩৮
৩৯
৪০
৪১
৪২
৪৩
৪৪
৪৫
৪৬
৪৭
৪৮
৪৯
৫০
৫১
প্রধান মন্দির
ভৈরবী মন্দির, কামাখ্যা
নীলাচল পাহাড়, গুয়াহাটি, আসাম
দশমহাবিদ্যার মন্দিরগুলির একটি; কামাখ্যা চত্বরে ভুবনেশ্বরী মন্দিরের কাছেই।
ত্রিপুরাভৈরবী ঘাট, বারাণসী — গঙ্গার এই ঘাটের নাম দেবী ত্রিপুরাভৈরবীর নামে; ঘাটের কাছেই তাঁর মন্দির।
মন্দির
এই মন্দিরের চিত্র পাওয়া যায় নাই।
বিগ্রহ
বিগ্রহের চিত্র পাওয়া যায় নাই।
কাহিনী
তপস্যার আগুন
একটি উপদেশ-কাহিনী প্রচলিত আছে। এক সাধক বহু বছর ভৈরবীর সাধনা করেও কিছু পাননি। ক্লান্ত হয়ে তিনি বললেন, ‘মা, তুমি কি শুধু পোড়াতেই জানো?’ রাতে দেবী স্বপ্নে এসে বললেন, ‘সোনার আকরিক আগুনে দিলে সে কাঁদে, ভাবে তাকে নষ্ট করা হচ্ছে। আগুন নিভলে দেখা যায় ময়লাটুকুই পুড়েছে, সোনা রয়ে গেছে। আমি নষ্ট করি না, বাদ দিই।’
বই
- শ্রীশ্রীচণ্ডী
লেখক / সংকলক: স্বামী জগদীশ্বরানন্দ (অনুবাদ ও টীকা)
প্রকাশক: উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা
‘নমো দেব্যৈ’ স্তুতি এই গ্রন্থেই।
এই রূপের প্রচলিত বাংলা গান বিশেষ নাই। সমস্ত গান →