কমলা
দশম মহাবিদ্যা · কমলাত্মিকা · মহালক্ষ্মী · শ্রী
পরিচয়
দশমহাবিদ্যার অন্তিম ও সর্বাপেক্ষা সৌম্য রূপ — কমলা, অর্থাৎ পদ্মে অধিষ্ঠিতা। ইনিই তন্ত্রের মহালক্ষ্মী। কালী দিয়া যে তালিকার আরম্ভ, কমলা দিয়া তাহার শেষ — সংহার হইতে শ্রী পর্যন্ত সম্পূর্ণ বৃত্ত।
রূপ — স্বর্ণের ন্যায় অঙ্গকান্তি, পদ্মাসনে উপবিষ্টা, চারি হস্তে দুইটি পদ্ম, বর ও অভয়। চতুর্দিকে চারিটি শ্বেত হস্তী স্বর্ণকলসে তাঁহাকে অভিষেক করিতেছে।
সাধকেরা মনে করাইয়া দেন — কমলা কেবল অর্থের দেবী নহেন; অধর্মের পথে যে ধন আসে, তাহা শ্রী নহে। সমুদ্রমন্থনে লক্ষ্মীর পূর্বে উঠিয়াছিলেন জ্যেষ্ঠা (অলক্ষ্মী), যাঁহাকে ধূমাবতীর সহিত এক বলিয়া ধরা হয় — সেই অর্থে কমলা ও ধূমাবতী একই মুদ্রার দুই পৃষ্ঠ: একজন পূর্ণতা, অন্যজন শূন্যতা।
উৎপত্তির কাহিনী
সমুদ্রমন্থনের কাহিনী। দেবাসুর মিলিয়া মন্দার পর্বত দ্বারা ক্ষীরসাগর মন্থন করিতেছিলেন। একে একে উঠিয়া আসিল চন্দ্র, কামধেনু, পারিজাত, ঐরাবত, বারুণী। অনন্তর উঠিয়া আসিলেন এক দেবী — হস্তে পদ্ম, অঙ্গে স্বর্ণাভা।
সমুদ্র স্বয়ং তাঁহাকে মাল্য পরাইলেন, নদীরা জল দিলেন, চারিটি দিগ্গজ স্বর্ণকলস তুলিয়া তাঁহাকে স্নান করাইল। দেবতারা স্তব করিলেন। তিনি বিষ্ণুকে বরণ করিয়া তাঁহার বক্ষে স্থান লইলেন। শ্রী — সৌন্দর্য, সম্পদ, সৌভাগ্য — তাঁহারই নাম; আর তাঁহার আসন পদ্ম, তাই কমলা।
তন্ত্র বলে, লক্ষ্মী চঞ্চলা — তিনি এক স্থানে থাকেন না। কমলারূপে তাঁহাকে স্থির করা যায়, কারণ এই রূপে তিনি মহাবিদ্যা, নিছক ধনদাত্রী নহেন।
মন্ত্র
মন্ত্রের নাম (একাক্ষর, ত্র্যক্ষর …) আসে তাহার অক্ষরসংখ্যা হইতে; শাস্ত্রে সেই গণনায় আদির প্রণব (ওঁ) ধরা হয় না। বন্ধনীতে প্রণবসহ সমস্ত অক্ষরের সংখ্যা দেওয়া হইল।
একাক্ষর — বীজমন্ত্র (১ অক্ষর)
দ্ব্যক্ষর — সাম্রাজ্যলক্ষ্মী (২ অক্ষর)
ত্র্যক্ষর — সাম্রাজ্যলক্ষ্মী (৩ অক্ষর)
চতুরক্ষর (৪ অক্ষর)
পঞ্চাক্ষর (৫ অক্ষর)
অষ্টাক্ষর — সিদ্ধিলক্ষ্মী (ওঁ-সহ ৯ অক্ষর)
দশাক্ষর (১০ অক্ষর)
অষ্টমহালক্ষ্মী মন্ত্র (ওঁ-সহ ১০ অক্ষর)
নাম-মন্ত্র — পাঠান্তর (৭ অক্ষর)
ধ্যানমন্ত্র
বঙ্গানুবাদ
- কাঞ্চনের ন্যায় তাঁহার কান্তি; হিমালয়ের ন্যায় শুভ্র চারিটি হস্তী
- শুণ্ডে তুলিয়া ধরা স্বর্ণকলস হইতে অমৃত ঢালিয়া তাঁহাকে অভিষেক করিতেছে।
- চার হাতে বরমুদ্রা, দুইটি পদ্ম ও অভয়; মস্তকে উজ্জ্বল কিরীট।
- কটিদেশে ক্ষৌমবস্ত্র বাঁধা, তিনি পদ্মের উপর অবস্থিতা — সেই শ্রীকে বন্দনা করি।
শব্দে-শব্দে অর্থ
| শব্দ | অর্থ |
|---|---|
| কান্ত্যা | কান্তি দ্বারা |
| কাঞ্চন | স্বর্ণ |
| সন্নিভাম্ | সদৃশা |
| হিমগিরি | হিমালয় |
| প্রখ্যৈঃ | সদৃশ; বিশাল |
| চতুর্ভিঃ | চারিটি দ্বারা |
| গজৈঃ | গজ দ্বারা |
| হস্তোৎক্ষিপ্ত | শুণ্ড উত্তোলিত |
| হিরণ্ময় | স্বর্ণময় |
| অমৃতঘট | অমৃতপূর্ণ কলস |
| আসিচ্যমানাম্ | অভিষিক্তা হইতেছেন |
| শ্রিয়ম্ | শ্রীদেবীকে |
| বিভ্রাণাম্ | ধারণকারিণী |
| বরম্ | বর |
| অব্জযুগ্মম্ | দুইটি পদ্ম |
| অভয়ম্ | অভয় |
| কিরীট | মুকুট |
| উজ্জ্বলাম্ | দীপ্তিময়ীকে |
| ক্ষৌম | সূক্ষ্ম বস্ত্র |
| নিতম্ববিম্ব | নিতম্বের বৃত্তশোভা |
| ললিতাম্ | ললিতা; মনোহরা |
| বন্দে | বন্দনা করি |
| অরবিন্দস্থিতাম্ | পদ্মে অবস্থিতাকে |
প্রণাম মন্ত্র
বঙ্গানুবাদ
হে সর্বমঙ্গলের মঙ্গলস্বরূপা, হে বিষ্ণুর বক্ষে অধিষ্ঠিতা; হে কমলা, হে কমলালয়া — আমার প্রতি সর্বদা প্রসন্ন হও।
গায়ত্রী
বঙ্গানুবাদ
মহালক্ষ্মীকে জানি, বিষ্ণুপত্নীকে ধ্যান করি — সেই লক্ষ্মী আমাদের প্রেরণা দিন।
স্তোত্র — শ্রীসূক্ত (ঋগ্বেদ খিলসূক্ত) — সূচনা
বাংলা অর্থ
- হিরণ্যবর্ণা, হরিণী, স্বর্ণ ও রজতের মালায় ভূষিতা,
- চন্দ্রের ন্যায় আহ্লাদিনী, হিরণ্ময়ী সেই লক্ষ্মীকে, হে জাতবেদা অগ্নি, আমার নিকট আনয়ন কর।
- সেই লক্ষ্মীকে আনয়ন কর, যিনি একবার আসিলে আর চলিয়া যান না —
- যাঁহার কৃপায় আমি স্বর্ণ, গাভী, অশ্ব ও আপনজন লাভ করিব।
শ্রীকমলাস্তোত্রম্ — সম্পূর্ণ পাঠ
১
হে দেবী, তুমি ওঁকাররূপিণী, বিশুদ্ধ সত্ত্বরূপিণী; তুমিই দেবগণের জননী। হে সুন্দরী, প্রসন্না হও।
২
তন্মাত্র ও ভূতসমূহ তোমার বক্ষস্থল বলিয়া স্মৃত। তুমিই বেদগম্যা। হে সুন্দরী, প্রসন্না হও।
৩
দেব, দানব, গন্ধর্ব, যক্ষ, রাক্ষস ও কিন্নর — হে লক্ষ্মী, সকলে সর্বদা তোমার স্তব করে। হে সুন্দরী, প্রসন্না হও।
৪
তুমি লোকাতীতা, দ্বৈতাতীতা, সমস্ত ভূতে বেষ্টিতা এবং বিদ্বজ্জন কর্তৃক কীর্তিতা। হে সুন্দরী, প্রসন্না হও।
৫
হে লক্ষ্মী, তুমি সদা পরিপূর্ণা, শরণার্থীদের ত্রাত্রী; তুমি বিশ্বাদ্যা ও বিশ্বকর্ত্রী। হে সুন্দরী, প্রসন্না হও।
৬
তুমি ব্রহ্মরূপা ও সাবিত্রী; তোমার দীপ্তিতেই জগৎ ভাসিত হয়। তুমি বিশ্বরূপা ও বরেণ্যা। হে সুন্দরী, প্রসন্না হও।
৭
ক্ষিতি, অপ্, তেজ, মরুৎ ও ব্যোম — এই পঞ্চভূতের স্বরূপিণী তুমি; বন্ধনাদিরও কারণ তুমিই। হে সুন্দরী, প্রসন্না হও।
৮
মহেশের নিকট তুমি হৈমবতী, কেশবের নিকট কমলা, আর ব্রহ্মার প্রেয়সীও তুমিই। হে সুন্দরী, প্রসন্না হও।
৯
তুমিই চণ্ডী, দুর্গা, কালিকা ও কৌশিকী; সিদ্ধিরূপিণী, যোগিনী ও যোগগম্যা। হে সুন্দরী, প্রসন্না হও।
১০
বাল্যে তুমি বালিকা, যৌবনে যুবতী, স্থবির বয়সে বৃদ্ধরূপা। হে সুন্দরী, প্রসন্না হও।
১১
তুমি গুণময়ী ও গুণাতীতা; আদ্যা, বিদ্যা ও সনাতনী; মহত্তত্ত্বাদিতে সংযুক্তা। হে সুন্দরী, প্রসন্না হও।
১২
তুমি তপস্বিনী ও তপঃসিদ্ধি; যাঁহারা স্বর্গ কামনা করেন, তাঁহাদের নিকট তুমিই স্বর্গসিদ্ধি। তুমি চিন্ময়ী প্রকৃতি। হে সুন্দরী, প্রসন্না হও।
১৩
হে দেবী, তুমিই জগতের আদি, তুমিই স্থিতির কারণ, অন্তে তুমিই নিধনস্থান; স্বতন্ত্রা স্বেচ্ছাময়ীও তুমিই।
১৪
চরাচর ভূতগণের বাহিরে ও অন্তরে তুমিই আছ; হে ভক্তবৎসলা, ব্যাপ্য ও ব্যাপকরূপে তুমি ভাসমান।
১৫
তোমার মায়ায় জ্ঞান হৃত হইয়া, আত্মা নষ্ট হইয়া, বিচেতন জীবগণ পাপপুণ্যের বশে সর্বদা গতাগতি প্রাপ্ত হয়।
১৬
শুক্তিতে রজতের ন্যায় জগৎ ততক্ষণই সত্য বলিয়া ভাসে, যতক্ষণ চিত্তে প্রকৃত জ্ঞান উদিত না হয়।
১৭
তোমার জ্ঞান হইতে বিচ্যুত হইয়া যাঁহারা পুত্র, দারা ও গৃহাদিতে আসক্ত থাকেন, তাঁহাদের পক্ষে সেই সকল বিষয় অন্তে নিশ্চিতই দুঃখপ্রদ হয়।
১৮
হে দেবেশী, তোমার আজ্ঞাতেই গগনে সূর্যমণ্ডল ও চন্দ্র নিত্য ভ্রমণ করে। হে সুন্দরী, প্রসন্না হও।
১৯
তুমি ব্রহ্মা, ঈশ ও বিষ্ণুর জননী; ব্রহ্ম নামে আখ্যাতা ও ব্রহ্মসংশ্রয়া; ব্যক্ত ও অব্যক্ত উভয়েই বিরাজমানা। হে দেবেশী, হে সুন্দরী, প্রসন্না হও।
২০
হে মহেশ্বরী, তুমি অচলা, সর্বগা ও মায়াতীতা; শিবাত্মা, শাশ্বতা ও নিত্যা। হে সুন্দরী, প্রসন্না হও।
২১
তুমি সর্বকার্যের নিয়ন্ত্রী ও সর্বভূতেশ্বরী; অনন্তা ও নিষ্কলা। হে সুন্দরী, প্রসন্না হও।
২২
তুমি সর্বেশ্বরী, সর্ববন্দ্যা, অচিন্ত্যা ও পরমাত্মিকা; ভুক্তি ও মুক্তি তুমিই দাও। হে সুন্দরী, প্রসন্না হও।
২৩
ব্রহ্মলোকে তুমি ব্রহ্মাণী, বৈকুণ্ঠে সর্বমঙ্গলা, অমরাবতীতে ইন্দ্রাণী, বরুণালয়ে অম্বিকা।
২৪
যমালয়ে কালরূপা, কুবেরভবনে শুভা, অগ্নিকোণে মহানন্দা। হে সুন্দরী, প্রসন্না হও।
২৫
নৈর্ঋতকোণে তুমি রক্তদন্তা, বায়ব্যে মৃগবাহিনী, পাতালে বৈষ্ণবীরূপা। হে সুন্দরী, প্রসন্না হও।
২৬
মণিদ্বীপে তুমি সুরসা, ঈশানকোণে শূলধারিণী, লঙ্কায় ভদ্রকালী। হে সুন্দরী, প্রসন্না হও।
২৭
সেতুবন্ধে তুমি রামেশ্বরী, সিংহলে দেবমোহিনী, শ্রীক্ষেত্রে বিমলা। হে সুন্দরী, প্রসন্না হও।
২৮
কালীঘাটে তুমি কালিকা, নীলপর্বতে কামাখ্যা, ওড্রদেশে বিরজা। হে সুন্দরী, প্রসন্না হও।
২৯
বারাণসীতে অন্নপূর্ণা, অযোধ্যায় মহেশ্বরী, গয়াধামে গয়াসুরী। হে সুন্দরী, প্রসন্না হও।
৩০
কুরুক্ষেত্রে ভদ্রকালী, ব্রজে কাত্যায়নী, দ্বারকায় মহামায়া। হে সুন্দরী, প্রসন্না হও।
৩১
সর্বজীবের ক্ষুধা তুমি, সাগরের বেলাও তুমি; মথুরায় মহেশ্বরী। হে সুন্দরী, প্রসন্না হও।
৩২
রামের জানকী তুমি, শিবের মনোমোহিনী, আর দক্ষের দুহিতাও তুমিই। হে সুন্দরী, প্রসন্না হও।
৩৩
তুমি বিষ্ণুভক্তিপ্রদা, কংসাসুরের বিনাশিনী ও রাবণের নাশিনী। হে সুন্দরী, প্রসন্না হও।
ফলশ্রুতি
৩৪
যে ব্যক্তি ভক্তিযুক্ত হইয়া এই পুণ্য লক্ষ্মীস্তোত্র পাঠ করে, তাহার সর্বজ্বরের ভয় নষ্ট হয় ও সর্বব্যাধির নিবারণ ঘটে।
৩৫
এই স্তোত্র মহাপুণ্য ও আপদ হইতে উদ্ধারের কারণ। যে নর সতত ত্রিসন্ধ্যায় অথবা এক সন্ধ্যায় ইহা পাঠ করে —
৩৬
সে সর্ব পাপ হইতে এবং সর্ব সংকট হইতে মুক্ত হয় — ভূতলে, স্বর্গে বা রসাতলে, ইহাতে সন্দেহ নাই।
৩৭
যে ভক্তিপরায়ণ সমস্তটি অথবা একটিমাত্র শ্লোকও পাঠ করে, সে সর্ব দুষ্কর উত্তীর্ণ হইয়া পরমা গতি লাভ করে।
৩৮
এই সুখদ ও মোক্ষদ স্তোত্র যে ভক্তিযুক্ত হইয়া পাঠ করে, সে কোটি তীর্থের ফল প্রাপ্ত হয় — ইহাতে সংশয় নাই।
৩৯
একমাত্র দেবী কমলা যাঁহার প্রতি সদা তুষ্টা, হে দেবেশী, ত্রিজগতে তাঁহার অসাধ্য কিছুই নাই।
৪০
কেবল এই স্তোত্র পাঠেই ভূতলে কী না সিদ্ধ হয়? সেই হেতু, হে পার্বতী, ইহাকে স্তোত্রশ্রেষ্ঠ বলা হইয়াছে — ইহা সত্য।
এইরূপে শ্রীকমলাস্তোত্র সম্পূর্ণ হইল।
কয়েকটি শব্দের অর্থ
| শব্দ | অর্থ |
|---|---|
| তন্মাত্র | ভূতের সূক্ষ্ম কারণ |
| বেদগম্যা | বেদের দ্বারা জ্ঞাতব্যা |
| কৌশিকী | দেবীর এক রূপ |
| মহত্তত্ত্ব | সাংখ্যের প্রথম বিকার |
| শুক্তিকারজত | শুক্তিতে রজতের ভ্রম |
| নিষ্কলা | অবিভক্তা |
| মণিদ্বীপ | দেবীর ধাম |
| ওড্রদেশ | ওড়িশা |
| শ্রীক্ষেত্র | পুরী |
| বেলা | সমুদ্রের সীমা |
| রসাতল | পাতাল |
| কোটিতীর্থফল | কোটি তীর্থদর্শনের ফল |
শ্রীকমলাষ্টকম্ — সম্পূর্ণ পাঠ
এই পাঠের বঙ্গানুবাদ এখনও লেখা হয় নাই; কেবল মূল সংস্কৃত দেওয়া হইল।
১
২
৩
৪
৫
৬
৭
৮
শ্রীকমলাকবচম্ — সম্পূর্ণ পাঠ
১
এই চতুরক্ষরা বিষ্ণুবনিতার কবচের ঋষি শ্রীভগবান্ শিব, ছন্দ অনুষ্টুপ্, দেবতা বাগ্ভবা, বীজ বাগ্ভব, শক্তি লজ্জা, কীলক রমা; ইহা কামবীজাত্মক কবচ। সুকবিত্ব, পাণ্ডিত্য ও সমৃদ্ধিসিদ্ধির নিমিত্ত পাঠে ইহার বিনিয়োগ। — ‘ঐং’কার সর্বসিদ্ধিদা বাগ্ভবা হইয়া মস্তক রক্ষা করুন; ‘হ্রীং’ দুই চক্ষুর মধ্যভাগ রক্ষা করুন, আর শাঙ্করী দুই চক্ষু।
২
জিহ্বায়, মুখমণ্ডলে, দুই কর্ণে, দন্তে ও নাসিকায়; ওষ্ঠে ও অধরে, দন্তপঙ্ক্তিতে, তালুমূলে ও হনুতে —
৩
শ্রীবর্ণরূপিণী বিষ্ণুবনিতা লক্ষ্মী আমাকে রক্ষা করুন। দুই কর্ণে, দুই ভুজে ও দুই স্তনে পার্বতী রক্ষা করুন।
৪
হৃদয়ে, মণিবন্ধে, গ্রীবায় ও দুই পার্শ্বে; পৃষ্ঠদেশে, গুহ্যদেশে, বামে ও দক্ষিণে —
৫
উপস্থে, নিতম্বে, নাভিতে ও দুই জঙ্ঘায়; জানুচক্রে, দুই পদে, গোড়ালিতে ও অঙ্গুলিমূলে —
৬
স্বধা প্রাণশক্তিতে, সীমন্তে ও মস্তকে রক্ষা করুন; সমুন্নতিরূপা মহাদেবী কামেশী সর্বাঙ্গ রক্ষা করুন।
৭
পুষ্টিরূপা মহামায়া রক্ষা করুন, উৎকৃষ্টি সর্বদা রক্ষা করুন; ঋদ্ধিরূপা দেবী শম্ভুবল্লভা সর্বত্র সদা রক্ষা করুন।
৮
বাগ্ভবা সর্বদা রক্ষা করুন, হরগেহিনী আমাকে রক্ষা করুন; মহাদেবী রমা রক্ষা করুন, স্বয়ং স্বরাট্ মায়া রক্ষা করুন।
৯
বিষ্ণুমায়া সুরেশ্বরী লক্ষ্মী আমার সর্বাঙ্গ রক্ষা করুন; বিজয়া গৃহে রক্ষা করুন, জয়া আমাকে সদা রক্ষা করুন।
১০
শিবদূতী সদা রক্ষা করুন, সুন্দরী সর্বদা; ভৈরবী সর্বত্র রক্ষা করুন, ভেরুণ্ডা সর্বদা রক্ষা করুন।
১১
ত্বরিতা আমাকে নিত্য রক্ষা করুন, উগ্রতারা সদা; কালিকা আমাকে নিত্য রক্ষা করুন, কালরাত্রি সদা রক্ষা করুন।
১২
নবদুর্গা সদা রক্ষা করুন, কামাখ্যা সর্বদা; যোগিনীরা সর্বদা রক্ষা করুন, মুদ্রাগণ সদা রক্ষা করুন।
১৩
মাতৃকাদেবীগণ ও চক্রস্থ যোগিনীগণ সদা রক্ষা করুন — সর্বত্র, সর্বকার্যে ও সর্বকর্মে, সর্বদা। সর্বসমৃদ্ধিদা দেবদেবী লক্ষ্মী আমাকে রক্ষা করুন।
এইরূপে বিশ্বসারতন্ত্রে শ্রীকমলাকবচ সম্পূর্ণ হইল।
কয়েকটি শব্দের অর্থ
| শব্দ | অর্থ |
|---|---|
| বাগ্ভবা | বাগ্ভবা; বাক্শক্তির বীজ ‘ঐং’-এর অধিষ্ঠাত্রী |
| বিষ্ণুবনিতা | বিষ্ণুপত্নী, লক্ষ্মী |
| মণিবন্ধ | কব্জি |
| সীমন্ত | সিঁথি |
| ঘুটিকা | গোড়ালি |
| হরগেহিনী | হরের গৃহিণী, পার্বতী |
| মাত্রা | মাতৃকাগণ, সপ্তমাতৃকা |
প্রধান মন্দির
মহালক্ষ্মী মন্দির
কোলাপুর, মহারাষ্ট্র
দেশের প্রধান মহালক্ষ্মী পীঠ; শক্তিপীঠ বলে গণ্য। এখানে দেবী মহালক্ষ্মী বা অম্বাবাই নামে পূজিতা — দশমহাবিদ্যার কমলা আর পুরাণের মহালক্ষ্মী একই শক্তির দুই ধারা।
কামাখ্যা মন্দির, নীলাচল, গুয়াহাটি — কামাখ্যায় কমলার আলাদা মন্দির নেই — মূল মন্দিরের গর্ভগৃহেই, মাতঙ্গীর সঙ্গে, তিনি তান্ত্রিক রূপে পূজিতা।
মহালক্ষ্মী মন্দির, কোলাপুর — উইকিপিডিয়া
মন্দির

ছবি: A.Murali · CC0 · কমন্স

ছবি: A.Murali · CC0 · কমন্স
বিগ্রহ

ছবি: Tanmaykelkar (ইংরাজি উইকিপিডিয়া) · CC BY-SA 3.0 · কমন্স
কাহিনী
লক্ষ্মী কোথায় থাকেন
পুরাণের কথা — একবার নারদ লক্ষ্মীকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘মা, আপনি কোথায় থাকেন?’ লক্ষ্মী বললেন, ‘যে ঘরে ভোরবেলা উঠে ঘর পরিষ্কার করা হয়, যে ঘরে কেউ কারও নামে মিথ্যে বলে না, যে ঘরে অতিথি ফেরে না, যে ঘরে বড়দের সম্মান আছে — সেখানে আমি থাকি। আর যে ঘরে অকারণে ঝগড়া, অলসতা আর কৃপণতা, সেখানে আমার দিদি জ্যেষ্ঠা থাকেন।’ বাংলার ঘরে ঘরে লক্ষ্মীর পাঁচালীতে এই কথাই ঘুরে ফিরে আসে — লক্ষ্মী আসেন আচরণে, ভাগ্যে নয়।
বই
- শ্রীমদ্দেবীভাগবত পুরাণ
লেখক / সংকলক: কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস (বেদব্যাস)
প্রকাশক: গীতা প্রেস, গোরখপুর
লক্ষ্মী ও মহাশক্তির সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত। - শ্রীশ্রীচণ্ডী
লেখক / সংকলক: স্বামী জগদীশ্বরানন্দ (অনুবাদ ও টীকা)
প্রকাশক: উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা
মহালক্ষ্মী-চরিত, অর্থাৎ মধ্যম চরিত, এই গ্রন্থের দ্বিতীয় ভাগ।