মাতঙ্গী
নবম মহাবিদ্যা · উচ্ছিষ্টচাণ্ডালিনী · শ্যামলা · রাজমাতঙ্গী
পরিচয়
মাতঙ্গীকে বলা হয় তন্ত্রের সরস্বতী। বাক্শক্তি, সঙ্গীত, কবিতা, শিল্প — সমস্তই তাঁহার। কিন্তু সরস্বতীর শুভ্রতা নহে, তাঁহার বর্ণ শ্যাম; তিনি রত্নসিংহাসনে বসিয়া বীণা বাজান।
রূপ — শ্যামবর্ণা, ত্রিনয়না, মস্তকে চন্দ্রকলা, চারি হস্তে পাশ, অঙ্কুশ, ধনু ও বাণ — নীচের ধ্যানমন্ত্রে এইরূপই; অন্য ধ্যানে তাঁহার হস্তে বীণা, খড়্গ বা অভয়। শুকপক্ষী তাঁহার সঙ্গী — বাক্শক্তির প্রতীক।
তাঁহার আর এক নাম উচ্ছিষ্টচাণ্ডালিনী। ‘উচ্ছিষ্ট’ অর্থে ভোজনান্তে পড়িয়া থাকা অংশ — যাহা সাধারণ বিধানে অশুদ্ধ। মাতঙ্গীর পূজায় সেই উচ্ছিষ্টই নৈবেদ্য। ইঙ্গিত স্পষ্ট: তাঁহার নিকট উচ্চ-নীচ, শুদ্ধ-অশুদ্ধের ভেদ নাই।
উৎপত্তির কাহিনী
একটি কাহিনী — শিব ও পার্বতী একত্রে আহার করিতেছিলেন। আহারকালে কিঞ্চিৎ অন্ন ভূমিতে পড়িল। সেই উচ্ছিষ্ট অন্ন হইতে এক কন্যা উঠিয়া আসিলেন, এবং উভয়ের নিকটেই অবশিষ্ট আহার প্রার্থনা করিলেন। শিব বলিলেন, ‘তুমি উচ্ছিষ্টেই তৃপ্তা, অতএব তোমার নাম উচ্ছিষ্টচাণ্ডালিনী। যাহারা উচ্ছিষ্ট নিবেদন করিয়া ডাকিবে, তুমি তাহাদের নিকট যাইবে।’
মতঙ্গ মুনির কথাটি স্বতন্ত্র। তিনি বহুকাল তপস্যা করিয়াছিলেন, যেন সমস্ত প্রাণী তাঁহার বশে আসে। সেই তপস্যায় তুষ্টা হইয়া ত্রিপুরসুন্দরীর নয়ন হইতে এক শ্যামবর্ণা দেবী নির্গতা হইলেন। ইনিই রাজমাতঙ্গী; মতঙ্গের কন্যা বলিয়া নাম মাতঙ্গী।
লোকধারায় তিনি চণ্ডাল পরিবারে পালিতা — সেই হেতু যাঁহাদের সমাজ দূরে সরাইয়া রাখে, তাঁহাদেরই দেবী তিনি। প্রান্তিক সমাজে তাঁহার উপাসনার ধারা প্রাচীন বলিয়া গবেষকেরা মনে করেন।
মন্ত্র
মন্ত্রের নাম (একাক্ষর, ত্র্যক্ষর …) আসে তাহার অক্ষরসংখ্যা হইতে; শাস্ত্রে সেই গণনায় আদির প্রণব (ওঁ) ধরা হয় না। বন্ধনীতে প্রণবসহ সমস্ত অক্ষরের সংখ্যা দেওয়া হইল।
অষ্টাক্ষর (ওঁ-সহ ৯ অক্ষর)
নবাক্ষর (ওঁ-সহ ১০ অক্ষর)
মূলমন্ত্র (ওঁ-সহ ১৫ অক্ষর)
ধ্যানমন্ত্র
বঙ্গানুবাদ
- তাঁহার দেহ শ্যামবর্ণ, মস্তকে চন্দ্রকলা; তিনি ত্রিনয়না, রত্নসিংহাসনে উপবিষ্টা।
- চার বাহুতে পাশ, অঙ্কুশ, ধনু ও বাণ ঝলমল করিতেছে।
- মাণিক্য প্রভৃতি অলংকারে ভূষিতা, শ্যামা, মুখে মৃদু হাসি।
- নীলপদ্মের পাপড়ির ন্যায় তাঁহার আভা — সেই ভগবতী মাতঙ্গিনীর চিন্তা করিবে।
শব্দে-শব্দে অর্থ
| শব্দ | অর্থ |
|---|---|
| শ্যামাঙ্গীম্ | শ্যামবর্ণ অঙ্গবিশিষ্টা |
| শশিশেখরাম্ | মস্তকে চন্দ্রকলাধারিণী |
| ত্রিনয়নাম্ | তিন নয়নবিশিষ্টা |
| রত্নসিংহাসনস্থিতাম্ | রত্নসিংহাসনে উপবিষ্টা |
| বেদৈঃ | চারিটি (বেদ = চার, বেদের সংখ্যা ধরিয়া) |
| বাহুদণ্ডৈঃ | দণ্ডসদৃশ বাহু দ্বারা |
| সপাশ | পাশসহ |
| সৃণি | অঙ্কুশ |
| কোদণ্ড | ধনু |
| ইষু | বাণ |
| উজ্জ্বলাম্ | উজ্জ্বলা |
| মাণিক্যাদি | মাণিক্য প্রভৃতি |
| বিভূষণৈঃ | অলংকার দ্বারা |
| উপচিতাম্ | শোভিতা |
| শ্যামালিকাম্ | শ্যামা; শ্যামলা |
| সুস্মিতাম্ | মৃদুহাস্যময়ী |
| নীলোৎপলদল | নীলপদ্মের পাপড়ি |
| প্রভাম্ | যাঁহার আভা |
| ভগবতীম্ | ভগবতীকে |
| মাতঙ্গিনীম্ | মাতঙ্গীকে |
| চিন্তয়েৎ | চিন্তা করিবে |
প্রণাম মন্ত্র
বঙ্গানুবাদ
হে মাতঙ্গী, হে পরমেশ্বরী, হে সর্ববাক্সিদ্ধিদায়িনী; হে শ্যামাঙ্গী, হে শুভদা দেবী মাতঙ্গী — তোমাকে প্রণাম করি।
গায়ত্রী
বঙ্গানুবাদ
মাতঙ্গীকে জানি, উচ্ছিষ্টচাণ্ডালিনীকে ধ্যান করি — সেই দেবী আমাদের প্রেরণা দিন।
স্তোত্র — মাতঙ্গী স্তুতি
বাংলা অর্থ
- হে মাতঙ্গী, তুমি জগতের মাতা, বাগ্দেবী, বরদায়িনী, কল্যাণময়ী।
- তুমি বীণাবাদনে মগ্না, শ্যামবর্ণা, রত্নাসনে উপবিষ্টা।
- উচ্ছিষ্টেও তুমি প্রসন্না — শুদ্ধ ও অশুদ্ধের ভেদ তুমি কর না।
- সকল জাতির প্রতি তুমি সমদর্শিনী, হে দেবী মাতঙ্গী — তোমাকে প্রণাম করি।
শ্রীমাতঙ্গীস্তোত্রম্ — সম্পূর্ণ পাঠ
পাঠকের জন্য টীকা। ফলশ্রুতিতে মারণ, উচ্চাটন, স্তম্ভন প্রভৃতি অভিচার-কর্মের উল্লেখ আছে। এগুলি তন্ত্রের প্রাচীন শাস্ত্রীয় বর্ণনা; আজকের পূজা-পাঠে ইহাদের কোনও স্থান নাই, আর কাহারও ক্ষতি কামনা করা ভক্তির পথ নহে। পাঠটি এখানে শাস্ত্রের নথি হিসাবে অবিকল দেওয়া হইল। ‘নারীগণ দাসীত্ব পান’ জাতীয় ফলশ্রুতিও সেই যুগের ভাষা; আজকের দৃষ্টিতে তাহা গ্রহণযোগ্য নহে।
১
মধুপানে মত্তনয়না, মাতঙ্গের (হস্তীর) ন্যায় মন্থরগামিনী, কুম্ভীকুম্ভের ন্যায় পীবর কুচা, কুম্ভাদি পাত্রে অঞ্চিতা; ধ্যাতার সুপুত্রপ্রদা সেই শর্বাণীর আমি ধ্যান করি — সুর, সিদ্ধ ও সাধ্যগণের বনিতাগণ যাঁহার পাদুকা সেবা করেন।
২
মহিষাদি রাক্ষসকৃত অন্ধকারে মাতঙ্গী একমাত্র দীপ ও মণি; মন্বাদি কর্তৃক স্তুত মন্ত্ররাজে বিলসিত, সদ্ভক্তের চিন্তামণি; শ্রীমৎ কৌলিক দান ও হাস্যরচনার চাতুর্যে রাকামণি — হে আদ্যমহিমে, আমার ভাগ্যের রক্ষামণি হইয়া তুমি হৃদয়ে বাস কর।
৩
জয় হউক হে দেবী, হে বিশালাক্ষী; জয় হউক হে সর্বেশ্বরী। হে অঞ্জনগিরির ন্যায় শ্যামবর্ণা, হে মহাদেবপ্রিয়ংকরী — তোমার জয় হউক।
৪
হে মহাবিশ্বেশের দয়িতা, হে ব্রহ্মাদি কর্তৃক পূজিতা, তোমার জয় হউক। হে কুলনায়িকা, আমি পুষ্পাঞ্জলি দিতেছি — গ্রহণ কর।
৫
জয় হউক হে মাতা মহাকৃষ্ণা, জয় হউক হে নীলোৎপলপ্রভা। হে মনোহারিণী, তোমাকে প্রণাম; হে বশংকরী, তোমাকে প্রণাম।
৬
জয় হউক হে নরগণের সৌভাগ্যদা, হে লোকমোহিনী — তোমাকে প্রণাম। হে পুরুষগণের সর্বৈশ্বর্যপ্রদা, হে সর্ববিদ্যাপ্রদা — প্রণাম।
৭
সর্ব আপদের নাশকারিণী, সর্ব দারিদ্র্যের নাশিনী — হে মাতঙ্গতনয়া, তোমাকে প্রণাম; হে চাণ্ডালী, হে কামদা, প্রণাম।
৮
হে নীলাম্বরা, হে নীল অলকসমন্বিতা, তোমাকে প্রণাম। হে মহাবাণী, তোমাকে প্রণাম; হে মহালক্ষ্মী, তোমাকে প্রণাম।
৯
হে মহামাতঙ্গী, আমি নিত্য তোমার পাদাব্জে প্রণাম করি। মহাদেবী মাতঙ্গীর এই উত্তম স্তোত্র কথিত হইল।
ফলশ্রুতি
১০
যে মানবোত্তম নিত্য এই সর্বকামপ্রদ স্তোত্র পাঠ করেন, তিনি সকল পাপ হইতে বিমুক্ত হইয়া সমগ্র পুণ্য ভোগ করেন।
১১
রাজারা দাসত্ব প্রাপ্ত হন, নারীগণ দাসীত্ব পান; সমগ্র জগৎ শীঘ্রই তাঁহার অনুগত হয় — ইহা ধ্রুব।
১২
বাক্যে তিনি মহাকবি হন, সাক্ষাৎ বাগীশ্বর হন; অচলা শ্রী লাভ করেন এবং অণিমাদি অষ্টসিদ্ধি প্রাপ্ত হন।
১৩
ত্রৈলোক্যেও দুর্লভ সমস্ত মনোরথ তিনি লাভ করেন এবং অন্তে শিবত্ব প্রাপ্ত হন — ইহাতে বিচারের প্রয়োজন নাই।
শ্রীরাজমাতঙ্গীর পাদুকায় এই অর্পণ হউক। এইরূপে শ্রীমাতঙ্গীস্তোত্র সম্পূর্ণ হইল।
কয়েকটি শব্দের অর্থ
| শব্দ | অর্থ |
|---|---|
| মাতঙ্গ | হস্তী (দেবীর নাম মাতঙ্গী — মতঙ্গ মুনির কন্যা বলিয়া) |
| কুম্ভীকুম্ভ | হস্তীর মস্তকের কুম্ভ |
| শর্বাণী | শর্ব অর্থাৎ শিবের শক্তি |
| চিন্তামণি | ইচ্ছাপূরক রত্ন |
| রাকামণি | পূর্ণিমার চন্দ্রসদৃশ মণি |
| অঞ্জনগিরি | অঞ্জনবর্ণ পর্বত |
| কুলনায়িকা | কুলাচারের অধিষ্ঠাত্রী |
| নীলোৎপল | নীলপদ্ম |
| বশঙ্করী | বশংকরী; বশীকরণকারিণী |
| চাণ্ডালী | মাতঙ্গীর এক নাম |
| অলক | কেশগুচ্ছ |
| বাগীশ্বর | বাক্যের অধীশ্বর |
| অণিমাদি | অণিমা প্রভৃতি অষ্টসিদ্ধি |
শ্রীমাতঙ্গীস্তোত্রম্ (দ্বিতীয়) — সম্পূর্ণ পাঠ
পাঠকের জন্য টীকা। এই স্তোত্রে গোমাংস, মদ্য, রজস্বলা নারী প্রভৃতির উল্লেখ তান্ত্রিক বামাচারের পরিভাষা — সাধারণ পূজার বিধি নহে। ফলশ্রুতির মারণ-কর্মও আজকের পূজা-পাঠে স্থান পায় না। পাঠটি শাস্ত্রের নথি হিসাবে অবিকল দেওয়া হইল।
এই পাঠের বঙ্গানুবাদ এখনও লেখা হয় নাই; কেবল মূল সংস্কৃত দেওয়া হইল।
১
২
৩
৪
৫
৬
৭
৮
শ্রীমাতঙ্গিনীকবচম্ (ত্বরিতফলদায়িনী) — সম্পূর্ণ পাঠ
এই পাঠের বঙ্গানুবাদ এখনও লেখা হয় নাই; কেবল মূল সংস্কৃত দেওয়া হইল।
১
২
৩
৪
৫
৬
৭
৮
৯
১০
১১
১২
১৩
১৪
১৫
১৬
১৭
১৮
১৯
২০
২১
২২
২৩
২৪
২৫
প্রধান মন্দির
কামাখ্যা মন্দির (মাতঙ্গী)
নীলাচল পাহাড়, কামাখ্যা, গুয়াহাটি, আসাম
কামাখ্যায় মাতঙ্গীর আলাদা মন্দির নেই — মূল মন্দিরের গর্ভগৃহেই, কমলার সঙ্গে, তিনি পূজিতা। বাংলায় ও আসামে মাতঙ্গীর স্বতন্ত্র মন্দির বিরল; বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তিনি দশমহাবিদ্যার সমষ্টিগত মন্দিরে পূজিতা।
রাজমাতঙ্গী মন্দির, বারাণসী ও দক্ষিণ ভারতের শ্রীবিদ্যা পীঠগুলি — শ্রীবিদ্যার ধারায় মাতঙ্গী ‘শ্যামলা’ নামে ললিতার মন্ত্রিণী রূপে পূজিতা।
মন্দির
এই মন্দিরের চিত্র পাওয়া যায় নাই।
বিগ্রহ
বিগ্রহের চিত্র পাওয়া যায় নাই।
কাহিনী
উচ্ছিষ্টের মর্যাদা
একটি প্রচলিত কাহিনী — এক ব্রাহ্মণ পণ্ডিত মাতঙ্গীর সাধনা করতে গিয়ে আটকে গেলেন। উচ্ছিষ্ট নিবেদনের বিধান তিনি মানতে পারছেন না; স্নান করে, শুদ্ধ বস্ত্রে, শুদ্ধ নৈবেদ্যে পূজা করেন, কিছুই হয় না। শেষে গুরু বললেন, ‘তুমি ভুল জিনিস শুদ্ধ করছ। থালা নয়, মন।’ পরদিন তিনি নিজের খাওয়ার পরে পড়ে থাকা অন্নটুকুই সামনে রেখে ডাকলেন, আর প্রথমবার তাঁর কণ্ঠে সুর এল। কথিত আছে, সেদিন থেকে তাঁর কথায় মানুষ বশ হত — মাতঙ্গী বাক্সিদ্ধি দিয়েছিলেন।
বই
- শ্রীললিতাসহস্রনাম
লেখক / সংকলক: বেদব্যাস (প্রচলিত মতে)
প্রকাশক: গীতা প্রেস, গোরখপুর
‘মন্ত্রিণী’ নামে মাতঙ্গী-শ্যামলার উল্লেখ এখানেই।