শক্তি
দেবীর রূপ, মন্ত্র, কাহিনী ও সঙ্গীত

ধূমাবতী

সপ্তম মহাবিদ্যা · বিধবা · জ্যেষ্ঠা · অলক্ষ্মী

পরিচয়

দশমহাবিদ্যার একমাত্র বিধবা রূপ। তাঁহার সঙ্গে শিব নাই — কারণ তিনি শিবকেই গ্রাস করিয়াছেন। সেই হেতু তিনি ‘একাকিনী’, আর তাঁহার রূপ শূন্যতার।

রূপ — বিবর্ণা, দীর্ঘাঙ্গী, শীর্ণা, মলিন বসন, রুক্ষ এলোমেলো কেশ, দন্ত পড়িয়া গিয়াছে। কাকধ্বজ রথে অথবা কাকের পৃষ্ঠে তিনি উপবিষ্টা; হস্তে শূর্প। বদনে সর্বদা ক্ষুধা।

দেখিতে অশুভ, কিন্তু তন্ত্র বলে — যে সমস্ত ভয় ও অভাবকে মা বলিয়া মানিয়া লইতে পারে, তাহার আর হারাইবার কিছু থাকে না। ধূমাবতী দুঃখকেই দেবী করিয়া তোলেন। বিপদ, রোগ, বিবাদ ও শত্রু হইতে রক্ষা পাইবার নিমিত্ত তাঁহার উপাসনা।

উৎপত্তির কাহিনী

কাহিনী এই — একদা সতী শিবের সহিত ছিলেন, এবং তাঁহার প্রবল ক্ষুধা পাইল। পুনঃপুনঃ বলিলেন, ‘আমাকে কিছু আহার দাও।’ শিব ধ্যানমগ্ন, বলিলেন, ‘কিঞ্চিৎ অপেক্ষা কর।’

ক্ষুধা সহ্য করিতে না পারিয়া সতী কহিলেন, ‘তবে তোমাকেই খাই।’ — এবং শিবকে গ্রাস করিলেন। তৎক্ষণাৎ তাঁহার শরীর হইতে ধূম নির্গত হইতে লাগিল।

উদরের অভ্যন্তর হইতে শিব বলিলেন, ‘তুমি আমাকে গ্রাস করিলে, অতএব অদ্য হইতে তুমি বিধবা। এই ধূমাবৃত রূপেই তুমি থাকিবে, তোমার নাম হইবে ধূমাবতী।’ শিব নির্গত হইলেন, কিন্তু দেবীর ধূমের আবরণ আর ঘুচিল না।

সমুদ্রমন্থনের কথাও শোনা যায়। লক্ষ্মীর পূর্বে উত্থিতা হইয়াছিলেন জ্যেষ্ঠা, অর্থাৎ অলক্ষ্মী; তিনিই ধূমাবতী। যেখানে অভাব, সেইখানেই তাঁহার বাস।

মন্ত্র

মন্ত্রের নাম (একাক্ষর, ত্র্যক্ষর …) আসে তাহার অক্ষরসংখ্যা হইতে; শাস্ত্রে সেই গণনায় আদির প্রণব (ওঁ) ধরা হয় না। বন্ধনীতে প্রণবসহ সমস্ত অক্ষরের সংখ্যা দেওয়া হইল।

সপ্তাক্ষর (ওঁ-সহ ৮ অক্ষর)

ওঁ ধূং ধূমাবতি স্বাহা

অষ্টাক্ষর (ওঁ-সহ ৯ অক্ষর)

ওঁ ধূং ধূং ধূমাবতি স্বাহা

নবাক্ষর (ওঁ-সহ ১০ অক্ষর)

ওঁ ধূং ধূং ধূং ধূমাবতি স্বাহা

চতুর্দশাক্ষর (ওঁ-সহ ১৫ অক্ষর)

ওঁ ধূং ধূং ধুর ধুর ধূমাবতি ক্রোং ফট্ স্বাহা

মূলমন্ত্র (ওঁ-সহ ১১ অক্ষর)

ওঁ ধূং ধূং ধূমাবতীদেব্যৈ স্বাহা

ধ্যানমন্ত্র

বিবর্ণা চঞ্চলা রুষ্টা দীর্ঘা চ মলিনাম্বরা। বিবর্ণকুন্তলা রূক্ষা বিধবা বিরলদ্বিজা॥ কাকধ্বজরথারূঢ়া বিলম্বিতপয়োধরা। শূর্পহস্তাতিরূক্ষাক্ষী ধূতহস্তা বরান্বিতা॥ প্রবৃদ্ধঘোণা তু ভৃশং কুটিলা কুটিলেক্ষণা। ক্ষুৎপিপাসার্দিতা নিত্যং ভয়দা কলহাস্পদা॥

বঙ্গানুবাদ

শব্দে-শব্দে অর্থ

প্রথম পদে কোনও পাঠে ‘রুষ্টা’ (ক্রুদ্ধা), কোনওটিতে ‘দুষ্টা’; এখানে ‘রুষ্টা’ রাখা হইল। দুইটির অর্থই নীচে দেওয়া হইল।

শব্দঅর্থ
বিবর্ণাফ্যাকাশে
চঞ্চলাঅস্থিরা
দুষ্টাদুষ্টা (পাঠান্তরে ‘রুষ্টা’ — ক্রুদ্ধা)
রুষ্টাক্রুদ্ধা
দীর্ঘাদীর্ঘাঙ্গী
মলিনাম্বরামলিন বস্ত্রপরিহিতা
বিবর্ণকুন্তলাবিবর্ণ কেশযুক্তা
রূক্ষারুক্ষা; শুষ্কা
বিরলদ্বিজাবিরল দন্তযুক্তা
ধ্বজধ্বজা
আরূঢাআরোহণকারিণী
বিলম্বিতলম্বিত
পয়োধরাস্তন
শূর্পকুলা; শস্য ঝাড়িবার পাত্র
হস্তাহস্তে ধারণকারিণী
অতিরূক্ষঅত্যন্ত রুক্ষ
অক্ষনয়ন
ধূতহস্তাকম্পমান হস্তযুক্তা
বরান্বিতাবরদানসমন্বিতা
প্রবৃদ্ধঅতিবৃদ্ধ; বৃহৎ
ঘোণানাসিকা
কুটিলাবক্রা
কুটিলেক্ষণাবক্রদৃষ্টিযুক্তা
ক্ষুৎক্ষুধা
পিপাসাতৃষ্ণা
অর্দিতাপীড়িতা
ভয়দাভয়দায়িনী
কলহাস্পদাকলহের আশ্রয়স্বরূপা

প্রণাম মন্ত্র

ওঁ ধূমাবতি মহাবিদ্যে সর্বদুঃখনিবারিণি। দারিদ্র্যদুঃখশমনী ধূমাবতি নমোঽস্তু তে॥

বঙ্গানুবাদ

হে ধূমাবতী, হে মহাবিদ্যা, হে সর্বদুঃখনিবারিণী; হে দারিদ্র্য ও দুঃখের শমনকারিণী ধূমাবতী, তোমাকে প্রণাম।

গায়ত্রী

ওঁ ধূমাবত্যৈ বিদ্মহে সংহাররূপিণ্যৈ ধীমহি। তন্নো ধূমা প্রচোদয়াৎ॥

বঙ্গানুবাদ

ধূমাবতীকে জানি, সংহাররূপিণীকে ধ্যান করি — সেই ধূমা আমাদের প্রেরণা দিন।

স্তোত্র — ধূমাবতী স্তুতি

প্রাতর্যা ভবতি কুমারিকা মধ্যাহ্নে যুবতী তথা। সায়াহ্নে বৃদ্ধরূপা চ সা ধূমাবতি নমোঽস্তু তে॥ ক্ষুৎপিপাসাময়ী মাতা নিত্যং দুঃখৌঘনাশিনী। শত্রুনাশকরী দেবী ধূমাবতি নমোঽস্তু তে॥

বাংলা অর্থ

শ্রীধূমাবতীস্তোত্রম্‌ (ধূমাবত্যষ্টকম্‌) — সম্পূর্ণ পাঠ

পাঠকের জন্য টীকা। ফলশ্রুতিতে মারণ, উচ্চাটন, স্তম্ভন প্রভৃতি অভিচার-কর্মের উল্লেখ আছে। এগুলি তন্ত্রের প্রাচীন শাস্ত্রীয় বর্ণনা; আজকের পূজা-পাঠে ইহাদের কোনও স্থান নাই, আর কাহারও ক্ষতি কামনা করা ভক্তির পথ নহে। পাঠটি এখানে শাস্ত্রের নথি হিসাবে অবিকল দেওয়া হইল।

১

প্রাতর্যাস্যাৎ কুমারী কুসুমকলিকয়া জাপমালাং জপন্তী মধ্যাহ্নে প্রৌঢরূপা বিকসিতবদনা চারুনেত্রা নিশায়াম্। সন্ধ্যায়াং বৃদ্ধরূপা গলিতকুচযুগা মুণ্ডমালাং বহন্তী সা দেবী দেবদেবী ত্রিভুবনজননী কালিকাপাতু যুষ্মান্॥

প্রাতে যিনি কুমারী — পুষ্পকলিকার জপমালা লইয়া জপ করেন; মধ্যাহ্নে প্রৌঢ়রূপা, বিকশিত বদনা ও চারুনেত্রা; সন্ধ্যায় বৃদ্ধরূপা, গলিতকুচযুগা, মুণ্ডমালাধারিণী — সেই দেবী, দেবদেবী, ত্রিভুবনজননী কালিকা তোমাদিগকে রক্ষা করুন।

২

বদ্ধ্বা খট্বাঙ্গকোটৌ কপিলবরজটা মণ্ডলম্পদ্ময়োনেঃ কৃত্বাদৈত্যোত্তমাঙ্গৈঃ স্রজমুরসিশিরশ্শেখরং তার্ক্ষ্যপক্ষৈঃ। পূর্ণংরক্তৈঃ সুরাণাং যমমহিষমহাশৃঙ্গমাদায়পাণৌ পায়াদ্বোবন্দ্যমানঃ প্রলয়মুদিতয়া ভৈরবঃ কালরাত্র্যাম্॥

খট্বাঙ্গের প্রান্তে কপিলবর্ণ জটামণ্ডল বাঁধিয়া, শ্রেষ্ঠ দৈত্যদের মুণ্ডে বক্ষে মালা ও গরুড়ের পালকে শিরোভূষণ রচনা করিয়া, দেবতাদের রক্তে পূর্ণ যমমহিষের মহাশৃঙ্গ হস্তে লইয়া — প্রলয়ে কালরাত্রির সহিত উদিত, বন্দ্যমান সেই ভৈরব তোমাদিগকে রক্ষা করুন।

৩

চর্বন্তীমস্থিখণ্ডং প্রকট কটকটা শব্দসঙ্ঘাতমুগ্রং কুর্বাণি প্রেতমধ্যে কহহকহকহা হাস্যমুগ্রং কৃশাঙ্গী। নিত্যং নৃত্যপ্রসক্তাং ডমরুডিমডিমাং স্ফারয়ন্তীং মুখাব্জং পায়ান্নশ্চণ্ডিকেয়ং ঝঝমঝমঝমা জল্পমানা ভ্রমন্তী॥

অস্থিখণ্ড চর্বণ করিতে করিতে প্রকট ‘কটকটা’ শব্দসংঘাত করিতেছেন; প্রেতের মধ্যে ‘কহহ-কহকহা’ উগ্র হাস্য করিতেছেন সেই কৃশাঙ্গী; ডমরুর ‘ডিমডিমা’ ধ্বনিতে মুখাব্জ স্ফারিত করিয়া ‘ঝঝম-ঝমঝমা’ জল্পনা করিতে করিতে ভ্রমণ করিতেছেন — সেই চণ্ডিকা আমাদিগকে রক্ষা করুন।

৪

টণ্টণ্টণ্টণ্টটণ্টা প্রকট টমটমা নাটঘণ্টাং বহন্তী স্ফেং স্ফেং স্ফেং স্ফারকারা টকটকিতহসা নাদসঙ্ঘট্ট ভীমা। লোলম্মুণ্ডাগ্রমালা ললহলহলহা লোললোলাগ্রবাচং চর্বন্তী চণ্ডমুণ্ডং মটমটমটিতে চর্বয়ন্তী পুনাতু॥

‘টণ্‌টণ্‌টণ্‌টণ্‌টটণ্টা’ শব্দে নাটঘণ্টা বহন করিতেছেন; ‘স্ফেং স্ফেং’ স্ফারকারা, টকটক শব্দময় হাস্যে ও নাদসংঘট্টে ভীমা; দোলায়মান মুণ্ডাগ্রমালা, ‘ললহলহলহা’ চঞ্চল বাক্‌; ‘মটমটমটিতে’ চণ্ড ও মুণ্ড চর্বণ করিতে করিতে তিনি আমাদিগকে পবিত্র করুন।

৫

বামে কর্ণে মৃগাঙ্কং প্রলয়পরিগতং দক্ষিণে সূর্যবিম্বং কণ্ঠে নক্ষত্রহারং বরবিকটজটাজূটকে মুণ্ডমালাম্। স্কন্ধেকৃত্বোরগেন্দ্রধ্বজনিকরযুতং ব্রহ্মকঙ্কালভারং সংহারে ধারয়ন্তী মম হরতু ভয়ং ভদ্রদা ভদ্রকালী॥

বাম কর্ণে মৃগাঙ্ক, দক্ষিণে সূর্যবিম্ব, কণ্ঠে নক্ষত্রহার, বিকট জটাজূটে মুণ্ডমালা; স্কন্ধে উরগেন্দ্রধ্বজ ও ব্রহ্মার কঙ্কালভার — সংহারকালে এই সকল ধারণ করিয়া সেই ভদ্রদা ভদ্রকালী আমার ভয় হরণ করুন।

৬

তৈলাভ্যক্তৈকবেণী ত্রপুময়বিলসৎ কর্ণিকাক্রান্তকর্ণা লৌহেনৈকেন কৃত্বাচরণনলিনকামাত্মনঃ পাদশোভাম্। দিগ্বাসা রাসভেন গ্রসতিজগদিদং মায়য়া কর্ণপূরা বর্ষিণ্যাতিপ্রবদ্ধা ধ্বজবিততভুজা সাসিদেবিত্বমেব॥

তৈলাভ্যক্ত একবেণী, ত্রপুময় কর্ণিকায় আক্রান্ত কর্ণ, একটিমাত্র লৌহে চরণনলিনের শোভা; দিগ্‌বাসা, রাসভযুক্তা — মায়ার দ্বারা এই জগৎ গ্রাস করেন; কর্ণপূরা, অতিপ্রবদ্ধা, ধ্বজের ন্যায় বিতত ভুজা — হে দেবী, তুমিই সেই দেবী।

৭

সঙ্গ্রামে হেতিকৃত্বৈস্সরুধিরদশনৈর্যদ্ভটানাং শিরোভির্মালামাবদ্ধ্যমূর্ধ্নি ধ্বজবিততভুজা ত্বং শ্মশানে প্রবিষ্টা। দৃষ্টা ভূতপ্রভূতৈঃ পৃথুতরজঘনা বদ্ধনাগেন্দ্র কাঞ্চী শূলগ্রব্যগ্রহস্তা মধুরুধিরসদা তাম্রনেত্রা নিশায়াম্॥

সংগ্রামে অস্ত্রে নিহত যোদ্ধাদের রক্তমাখা মস্তকে মালা গাঁথিয়া মূর্ধায় বাঁধিয়া, বিতত ভুজা হইয়া তুমি শ্মশানে প্রবেশ করিয়াছ। অসংখ্য ভূত তোমাকে দেখিতেছে; পৃথুতর জঘনা, কটিতে নাগেন্দ্রের কাঞ্চী, হস্তে শূলাগ্র, রুধিরে সদা রঞ্জিতা, রাত্রিতে তাম্রনেত্রা।

৮

দংষ্ট্রা রৌদ্রেমুখেঽস্মিংস্তববিশতিজগদ্দেবি সর্বং ক্ষণার্ধাৎ সংসারস্যান্তকালে নররুধিরবশাসম্প্লবেভূমধূম্রে। কালীকাপালিকী সা শবশয়নতরা যোগিনী যোগমুদ্রা রক্তারুদ্ধিঃ সভাস্থা মরণভয়হরা ত্বং শিবা চণ্ডঘণ্টা॥

হে দেবী, তোমার এই রৌদ্র মুখে ও দংষ্ট্রায় ক্ষণার্ধেই সমস্ত জগৎ প্রবেশ করে। সংসারের অন্তকালে, নররুধির ও বসার প্লাবনে ধূম্রাচ্ছন্ন ভূমিতে — সেই কালী, কাপালিকী, শবশয়নতরা, যোগিনী, যোগমুদ্রা, রক্তা, সভাস্থা, মরণভয়হরা শিবা চণ্ডঘণ্টা তুমিই।

ফলশ্রুতি

৯

ধূমাবত্যষ্টকং পুণ্যং সর্বাপদ্বিনিবারকম্। যঃ পঠেৎ সাধকো ভক্ত্যা সিদ্ধিং বিন্দতি বাঞ্ছিতাম্॥

এই পুণ্য ধূমাবত্যষ্টক সর্ব আপদের নিবারক। যে সাধক ভক্তিসহকারে ইহা পাঠ করেন, তিনি বাঞ্ছিত সিদ্ধি লাভ করেন।

১০

মহাপদি মহাঘোরে মহারোগে মহারণে। শত্রূচ্চাটে মারণাদৌ জন্তূনাং মোহনে তথা॥

মহাবিপদে, মহাঘোরে, মহারোগে, মহারণে; শত্রুর উচ্চাটনে, মারণাদিতে এবং জন্তুগণের মোহনেও —

১১

পঠেৎ স্তোত্রমিদং দেবি সর্বত্র সিদ্ধিভাগ্ভবেৎ। দেবদানবগন্ধর্বা যক্ষরাক্ষসপন্নগাঃ॥

হে দেবী, এই স্তোত্র পাঠ করিলে সর্বত্র সিদ্ধির ভাগী হয়। দেব, দানব, গন্ধর্ব, যক্ষ, রাক্ষস ও পন্নগ —

১২

সিংহ ব্যাঘ্রাদিকাস্সর্বে স্তোত্র স্মরণমাত্রতঃ। দূরাদ্দূরতরং যান্তি কিং পুনর্মানুষাদয়ঃ॥

সিংহ, ব্যাঘ্র প্রভৃতি সকলেই কেবল স্তোত্রস্মরণমাত্রেই দূর হইতে দূরতরে চলিয়া যায় — তবে মনুষ্যাদির কথা আর কী।

১৩

স্তোত্রেণানেন দেবেশি কিং ন সিদ্ধ্যতি ভূতলে। সর্বশান্তির্ভবেদ্দেবি হ্যন্তে নির্বাণতাং ব্রজেৎ॥

হে দেবেশী, এই স্তোত্রে ভূতলে কী না সিদ্ধ হয়? হে দেবী, সর্বশান্তি লাভ হয় এবং অন্তে নির্বাণ প্রাপ্তি ঘটে।

ইত্যূর্ধ্বাম্নায়ে ধূমাবতী স্তোত্রং সমাপ্তম্॥

এইরূপে ঊর্ধ্বাম্নায়ে ধূমাবতীস্তোত্র সমাপ্ত হইল।

কয়েকটি শব্দের অর্থ

শব্দঅর্থ
কুসুমকলিকাফুলের কুঁড়ি
গলিতকুচযুগাশিথিল স্তনযুগলবিশিষ্টা
খট্বাঙ্গমুণ্ডশীর্ষ দণ্ড
পদ্মযোনিব্রহ্মা
তার্ক্ষ্যগরুড়
মৃগাঙ্কচন্দ্র
উরগেন্দ্রনাগরাজ
ত্রপুরাং (টিন)
দিগ্বাসাদিগ্‌বাসা; দিক্‌ই যাঁহার বসন
রাসভগর্দভ — কোনও কোনও ধ্যানে ধূমাবতীর বাহন (প্রচলিত ধ্যানে কাক)
কাঞ্চীকটিবন্ধনী
বসামেদ
কাপালিকীকপালধারিণী
উচ্চাটনতন্ত্রোক্ত ষট্‌কর্মের একটি
স্তম্ভনগতিরোধ
পন্নগসর্প
নির্বাণপরম মুক্তি
শ্রীধূমাবত্যষ্টোত্তরশতনামস্তোত্রম্‌ — সম্পূর্ণ পাঠ

পাঠকের জন্য টীকা। এই পাঠে মাংস, মদ্য ও বলির মতো বামাচারী তান্ত্রিক উপচারের উল্লেখ আছে। এগুলি বিশেষ সাধনপথের পরিভাষা, সাধারণ গৃহপূজার বিধি নহে। পাঠটি শাস্ত্রের নথি হিসাবে অবিকল দেওয়া হইল।

এই পাঠের বঙ্গানুবাদ এখনও লেখা হয় নাই; কেবল মূল সংস্কৃত দেওয়া হইল।

১

ঈশ্বর উবাচ ধূমাবতী ধূম্রবর্ণা ধূম্রপানপরায়ণা । ধূম্রাক্ষমথিনী ধন্যা ধন্যস্থাননিবাসিনী ॥ ১॥

২

অঘোরাচারসন্তুষ্টা অঘোরাচারমণ্ডিতা । অঘোরমন্ত্রসম্প্রীতা অঘোরমন্ত্রপূজিতা ॥ ২॥

৩

অট্টাট্টহাসনিরতা মলিনাম্বরধারিণী । বৃদ্ধা বিরূপা বিধবা বিদ্যা চ বিরলদ্বিজা ॥ ৩॥

৪

প্রবৃদ্ধঘোণা কুমুখী কুটিলা কুটিলেক্ষণা । করালী চ করালাস্যা কঙ্কালী শূর্পধারিণী ॥ ৪॥

৫

কাকধ্বজরথারূঢা কেবলা কঠিনা কুহূঃ । ক্ষুৎপিপাসার্দিতা নিত্যা ললজ্জিহ্বা দিগম্বরী ॥ ৫॥

৬

দীর্ঘোদরী দীর্ঘরবা দীর্ঘাঙ্গী দীর্ঘমস্তকা । বিমুক্তকুন্তলা কীর্ত্যা কৈলাসস্থানবাসিনী ॥ ৬॥

৭

ক্রূরা কালস্বরূপা চ কালচক্রপ্রবর্তিনী । বিবর্ণা চঞ্চলা দুষ্টা দুষ্টবিধ্বংসকারিণী ॥ ৭॥

৮

চণ্ডী চণ্ডস্বরূপা চ চামুণ্ডা চণ্ডনিস্বনা । চণ্ডবেগা চণ্ডগতিশ্চণ্ডমুণ্ডবিনাশিনী ॥ ৮॥

৯

চাণ্ডালিনী চিত্ররেখা চিত্রাঙ্গী চিত্ররূপিণী । কৃষ্ণা কপর্দিনী কুল্লা কৃষ্ণারূপা ক্রিয়াবতী ॥ ৯॥

১০

কুম্ভস্তনী মহোন্মত্তা মদিরাপানবিহ্বলা । চতুর্ভুজা ললজ্জিহ্বা শত্রুসংহারকারিণী ॥ ১০॥

১১

শবারূঢা শবগতা শ্মশানস্থানবাসিনী । দুরারাধ্যা দুরাচারা দুর্জনপ্রীতিদায়িনী ॥ ১১॥

১২

নির্মাংসা চ নিরাকারা ধূতহস্তা বরান্বিতা । কলহা চ কলিপ্রীতা কলিকল্মষনাশিনী ॥ ১২॥

১৩

মহাকালস্বরূপা চ মহাকালপ্রপূজিতা । মহাদেবপ্রিয়া মেধা মহাসঙ্কটনাশিনী ॥ ১৩॥

১৪

ভক্তপ্রিয়া ভক্তগতির্ভক্তশত্রুবিনাশিনী । ভৈরবী ভুবনা ভীমা ভারতী ভুবনাত্মিকা ॥ ১৪॥

১৫

ভেরুণ্ডা ভীমনয়না ত্রিনেত্রা বহুরূপিণী । ত্রিলোকেশী ত্রিকালজ্ঞা ত্রিস্বরূপা ত্রয়ীতনুঃ ॥ ১৫॥

১৬

ত্রিমূর্তিশ্চ তথা তন্বী ত্রিশক্তিশ্চ ত্রিশূলিনী । ইতি ধূমামহৎস্তোত্রং নাম্নামষ্টোত্তরাত্মকম্ ॥ ১৬॥

১৭

ময়া তে কথিতং দেবি শত্রুসঙ্ঘবিনাশনম্ । কারাগারে রিপুগ্রস্তে মহোৎপাতে মহাভয়ে ॥ ১৭॥

১৮

ইদং স্তোত্রং পঠেন্মর্ত্যো মুচ্যতে সর্বসঙ্কটৈঃ । গুহ্যাদ্গুহ্যতরং গুহ্যং গোপনীয়ং প্রয়ত্নতঃ ॥ ১৮॥

১৯

চতুষ্পদার্থদং নৃণাং সর্বসম্পৎপ্রদায়কম্ ॥ ১৯॥
শ্রীধূমাবতীকবচম্‌ — সম্পূর্ণ পাঠ

১

শ্রীপার্বত্যুবাচ - ধূমাবত্যর্চনং শম্ভো শ্রুতং বিস্তরতো ময়া। কবচং শ্রোতুমিচ্ছামি তস্যা দেব বদস্ব মে॥

শ্রীপার্বতী কহিলেন — হে শম্ভু, ধূমাবতীর অর্চনা আমি বিস্তারে শুনিয়াছি। এখন তাঁহার কবচ শুনিতে ইচ্ছা করি; হে দেব, আমাকে বলুন।

২

শ্রীভৈরব উবাচ — শৃণু দেবি পরং গুহ্যং ন প্রকাশ্যং কলৌ যুগে। কবচং শ্রীধূমাবত্যাশ্শত্রুনিগ্রহকারকম্॥

শ্রীভৈরব কহিলেন — হে দেবী, শুন; ইহা পরম গুহ্য, কলিযুগে প্রকাশ্য নহে। ইহা শ্রীধূমাবতীর কবচ, শত্রুনিগ্রহকারক।

৩

ব্রহ্মাদ্যাদেবি সততং যদ্বশাদরিঘাতিনঃ। যোগিনো ভব শত্রুঘ্না যস্যা ধ্যান প্রভাবতঃ॥

হে দেবী, ব্রহ্মাদি দেবতারা যাঁহার বশে সতত শত্রুঘাতী; যাঁহার ধ্যানের প্রভাবে যোগীরাও শত্রুনাশক হন।

৪

ওঁ অস্য শ্রীধূমাবতীকবচস্য পিপ্পলাদ ঋষিঃ অনুষ্টুপ্ছন্দঃ শ্রীধূমাবতী দেবতা ধূং বীজম্ স্বাহা শক্তিঃ ধূমাবতী কীলকম্ শত্রুহননে পাঠে বিনিয়োগঃ॥ ওঁ ধূং বীজং মে শিরঃ পাতু ধূং ললাটং সদাবতু। ধূমা নেত্রযুগং পাতু বতী কর্ণৌ সদাবতু॥

এই শ্রীধূমাবতীকবচের ঋষি পিপ্পলাদ, ছন্দ অনুষ্টুপ্‌, দেবতা শ্রীধূমাবতী, বীজ ‘ধূং’, শক্তি ‘স্বাহা’, কীলক ‘ধূমাবতী’; শত্রুহননের নিমিত্ত পাঠে ইহার বিনিয়োগ। — ‘ধূং’ বীজ আমার শির রক্ষা করুক, ‘ধূং’ সর্বদা ললাট; ‘ধূমা’ দুই নেত্র রক্ষা করুক, ‘বতী’ সর্বদা দুই কর্ণ।

৫

দীর্ঘা তূদরমধ্যে তু নাভিং মে মলিনাম্বরা। শূর্পহস্তা পাতু গুহ্যং রূক্ষা রক্ষতু জানুনী॥

দীর্ঘা উদরের মধ্যভাগ রক্ষা করুন, মলিনাম্বরা নাভি; শূর্পহস্তা গুহ্যদেশ রক্ষা করুন, রূক্ষা দুই জানু।

৬

মুখং মে পাতু ভীমাখ্যা স্বাহা রক্ষতু নাসিকাম্। সর্বং বিদ্যাবতু কণ্ঠং বিবর্ণা বাহুযুগ্মকম্॥

ভীমা নামে যিনি, তিনি আমার মুখ রক্ষা করুন; স্বাহা নাসিকা রক্ষা করুন। সর্ববিদ্যা কণ্ঠ রক্ষা করুন, বিবর্ণা দুই বাহু।

৭

চঞ্চলা হৃদয়ং পাতু ধৃষ্টা পার্শ্বং সদাবতু। ধূমহস্তা সদা পাতু পাদৌ পাতু ভয়াবহা॥

চঞ্চলা হৃদয় রক্ষা করুন, ধৃষ্টা সর্বদা পার্শ্বদেশ; ধূমহস্তা সর্বদা রক্ষা করুন, ভয়াবহা দুই পদ রক্ষা করুন।

৮

প্রবৃদ্ধরোমা তু ভৃশং কুটিলা কুটিলেক্ষণা। ক্ষুৎপিপাসার্দিতা দেবী ভয়দা কলহপ্রিয়া॥

প্রবৃদ্ধরোমা, অতিশয় কুটিলা, কুটিলনয়না, ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় আর্তা, ভয়দাত্রী, কলহপ্রিয়া সেই দেবী —

ফলশ্রুতি

৯

সর্বাঙ্গং পাতু মে দেবী সর্বশত্রুবিনাশিনী। ইতি তে কবচং পুণ্যং কথিতং ভুবি দুর্লভম্॥

সর্বশত্রুবিনাশিনী সেই দেবী আমার সর্বাঙ্গ রক্ষা করুন। এইরূপে তোমাকে এই পুণ্য কবচ বলিলাম, যাহা ভুবনে দুর্লভ।

১০

ন প্রকাশ্যং ন প্রকাশ্যং ন প্রকাশ্যং কলৌ যুগে। পঠনীয়ং মহাদেবি ত্রিসন্ধ্যং ধ্যানতৎপরৈঃ। দুষ্টাভিচারো দেবেশি তদ্গাত্রং নৈব সংস্পৃশেৎ॥

কলিযুগে ইহা প্রকাশ্য নহে, প্রকাশ্য নহে, প্রকাশ্য নহে। হে মহাদেবী, ধ্যানতৎপর ব্যক্তিরা ত্রিসন্ধ্যায় ইহা পাঠ করিবেন। হে দেবেশী, দুষ্টের অভিচার তাঁহাদের দেহ স্পর্শও করিতে পারিবে না।

ইতি ভৈরবীভৈরব সংবাদে ধূমাবতীতত্ত্বে ধূমাবতীকবচং সম্পূর্ণম্।

এইরূপে ভৈরবী-ভৈরব সংবাদে ধূমাবতীতত্ত্বে ধূমাবতীকবচ সম্পূর্ণ হইল।

কয়েকটি শব্দের অর্থ

শব্দঅর্থ
বিনিয়োগপাঠের আগে ঋষি-ছন্দ-দেবতা নির্দেশ
কীলকমন্ত্রের ‘খিল’, যাহা খুলিলে মন্ত্র সক্রিয়
মলিনাম্বরামলিন বস্ত্র পরিহিতা
শূর্পকুলা
রূক্ষাশুষ্কা, নিরাভরণা
বিবর্ণাবর্ণহীনা, ফ্যাকাশে
অভিচারমারণ-উচ্চাটনাদি ক্রিয়া

প্রধান মন্দির

ধূমাবতী মন্দির
ধূপচণ্ডী, বারাণসী, উত্তরপ্রদেশ

ভারতের সবচেয়ে পরিচিত ধূমাবতী মন্দিরগুলির একটি; কাশীর পুরনো পাড়ার সরু গলির ভিতরে ছোট মন্দির।

ধূমাবতী মন্দির, দাতিয়া, মধ্যপ্রদেশ — পীতাম্বরা পীঠ চত্বরে, বগলামুখী মন্দিরের পাশে; প্রতিষ্ঠা ১৯৭৮ সালে। প্রচলিত নিয়মে সধবা নারীরা এখানে দেবীর দর্শন করেন না।

দশমহাবিদ্যা — উইকিপিডিয়া

মন্দির

এই মন্দিরের চিত্র পাওয়া যায় নাই।

বিগ্রহ

বিগ্রহের চিত্র পাওয়া যায় নাই।

কাহিনী

খিদে যখন দেবী

অনেক রূপের হাতে অস্ত্র; ধূমাবতীর হাতে কুলো। কুলো দিয়ে চাল ঝাড়া হয় — ভালোটা থাকে, খোসা উড়ে যায়। তাঁর কাজও তাই। তিনি কিছু দেন না, কেড়ে নেন; আর যা কেড়ে নেন তা আসলে খোসা। সাধকেরা বলেন, জীবনে যখন সব চলে যায়, আর কিছুই আঁকড়ে ধরার থাকে না — সেই মুহূর্তটাই ধূমাবতীর দর্শন। তাই তাঁকে অশুভ বলা যায় না; তিনি সেই মা, যিনি হাত খালি করে দিয়ে হাত ধরার জায়গা করে দেন।

বই


ধূমাবতীর গান →

সতর্কবার্তা। এই পৃষ্ঠার মন্ত্রসমূহ স্বেচ্ছায় জপ করিবার বস্তু নহে। দশমহাবিদ্যার তান্ত্রিক মন্ত্র — বিশেষতঃ বীজমন্ত্র, পঞ্চদশী, বগলামুখী, ছিন্নমস্তা, ধূমাবতী ও মাতঙ্গীর মন্ত্র — শাস্ত্রমতে দীক্ষা ব্যতীত জপের বিধান নাই। গুরুর নিকট দীক্ষা গ্রহণ করিয়া, তাঁহার আদেশে, তাঁহার তত্ত্বাবধানেই ইহা অনুষ্ঠেয়। গুরুর পথনির্দেশ ব্যতিরেকে কেহ স্বয়ং চেষ্টা করিবেন না। এখানে মন্ত্র উদ্ধৃত হইয়াছে পাঠ, পরিচয় ও অর্থবোধের নিমিত্ত — সাধনার নির্দেশিকারূপে নহে।

মন্ত্র, ধ্যান ও স্তোত্র নানা গ্রন্থে পাঠভেদে ভিন্ন হইয়া থাকে; অনুষ্ঠানে ব্যবহারের পূর্বে মুদ্রিত পুঁথি ও পঞ্জিকার সহিত মিলাইয়া লইবেন।

শক্তি — সমস্ত রূপের সূচি · স্বীকৃতি · গোপনীয়তার নীতি