দশমহাবিদ্যা — সমষ্টিগত পাঠ
এই পাতার চারিটি পাঠ কোনও এক রূপের নহে। ইহারা দশ মহাবিদ্যাকে একত্রে আবাহন করে — এক স্তোত্রেই কালী, তারা, ষোড়শী, ভুবনেশ্বরী, ভৈরবী, ছিন্নমস্তা, ধূমাবতী, বগলামুখী, মাতঙ্গী ও কমলা, দশজনেরই নাম আছে। প্রত্যেক রূপের নিজস্ব মন্ত্র, ধ্যান, স্তোত্র ও কবচ তাহার নিজের পাতায়।
মহাবিদ্যা মন্ত্র
মন্ত্রটির কাঠামো ছিন্নমস্তার মন্ত্রের মতো — ‘বজ্রবৈরোচনী’ ছিন্নমস্তারই নাম। যে গ্রন্থ হইতে ইহা লওয়া, সেখানে ইহা সমস্ত মহাবিদ্যার সাধারণ মন্ত্র বলিয়া ছাপা, শেষে ‘ঐং’ যুক্ত। ছিন্নমস্তার পাতায় যে মূলমন্ত্র (শ্রীং হ্রীং ক্লীং ঐং বজ্রবৈরোচনীয়ে হূং হূং ফট্ স্বাহা) দেওয়া আছে, তাহা ইহা হইতে কিঞ্চিৎ ভিন্ন।
মহাবিদ্যা ধ্যান
মহাবিদ্যা ধ্যানম্ — সম্পূর্ণ পাঠ
১
মহাদেবী চতুর্ভুজা, সর্পের যজ্ঞোপবীত ধারণ করিয়াছেন; তিনি মহাভয়ঙ্করী, করালবদনা, সিদ্ধ ও বিদ্যাধরগণে পরিবৃতা।
২
মুণ্ডমালার সারিতে তিনি আচ্ছন্না, কেশ মুক্ত ও আলুলায়িত, মুখে হাসি। সর্বকামনা সিদ্ধ হইবার নিমিত্ত মহাদেবীর এইরূপ ধ্যান করিতে হয়।
দশ মহাবিদ্যা স্তোত্র
দশ মহাবিদ্যা স্তোত্র — সম্পূর্ণ পাঠ
শ্রীশিব কহিলেন —
১
মারিণীর পথ দুর্লভ, তারিণীর পদ দুর্লভ; মন্ত্রের অর্থ, মন্ত্রচৈতন্য ও শবসাধনও দুর্লভ।
২
শ্মশানসাধন, যোনিসাধন, ব্রহ্মসাধন, ক্রিয়াসাধন, ভক্তিসাধন ও মুক্তিসাধন — ইহাও দুর্লভ। হে দেবেশি, তোমার প্রসাদেই সমস্ত সিদ্ধি সিদ্ধ হয়।
৩
হে চণ্ডিকে, প্রচণ্ডস্বরূপিণী, চণ্ড ও মুণ্ডের বিনাশিনী — তোমাকে নমস্কার। হে কালিকে, কালের মহাভয় যিনি নাশ করেন — তোমাকে নমস্কার।
৪
হে শিবে, হে জগদ্ধাত্রি, হে হরবল্লভে — রক্ষা কর, প্রসন্ন হও। জগৎপালনকারিণী জগদ্ধাত্রীকে প্রণাম করি।
৫
যিনি জগৎ আলোড়িত করেন, যিনি স্বয়ং বিদ্যা, যিনি জগৎ সৃষ্টি করেন — করালা, বিকটা, ঘোরা, মুণ্ডমালায় বিভূষিতা।
৬
হর যাঁহার অর্চনা করেন, হর যাঁহার আরাধনা করেন, সেই হরবল্লভাকে নমস্কার করি — গৌরী, গুরুপ্রিয়া, গৌরবর্ণ অলঙ্কারে ভূষিতা।
৭
হরিপ্রিয়া মহামায়াকে নমস্কার করি — সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা যাঁহার পূজা করেন।
৮
তুমি সিদ্ধা ও সিদ্ধেশ্বরী, সিদ্ধ ও বিদ্যাধরগণে পরিবৃতা, মন্ত্রসিদ্ধি ও যোনিসিদ্ধির দাত্রী, লিঙ্গশোভিতা। দুর্গতিনাশিনী দুর্গা মহামায়াকে প্রণাম করি।
৯
তুমি উগ্রা, উগ্রময়ী, উগ্রতারা, উগ্রগণে পরিবৃতা; নীলা, নীল মেঘের মতো শ্যামবর্ণা — সেই নীলসুন্দরীকে নমস্কার করি।
১০
শ্যামাঙ্গী, শ্যামবর্ণে গড়া ও শ্যামবর্ণে বিভূষিতা; সর্বার্থসাধিনী গৌরী জগদ্ধাত্রীকে প্রণাম করি।
১১
বিশ্বেশ্বরী, মহাঘোরা, বিকটা, ঘোরনাদিনী; তিনি আদ্যা — আদিগুরু মহেশ্বরেরও আদি, আদ্যনাথ যাঁহার পূজা করেন।
১২
শ্রীদুর্গা, ধনদা, অন্নপূর্ণা, পদ্মা, সুরেশ্বরী; চন্দ্রশেখরবল্লভা জগদ্ধাত্রীকে প্রণাম করি।
১৩
তুমি ত্রিপুরাসুন্দরী, বালা, অবলাগণে মণ্ডিতা; শিবদূতী, শিব যাঁহার আরাধনা করেন, শিব যাঁহার ধ্যান করেন — সনাতনী।
১৪
সুন্দরী, তারিণী, সমস্ত শিবাগণে বিভূষিতা; নারায়ণী, বিষ্ণুপূজ্যা, ব্রহ্মা-বিষ্ণু-হরের প্রিয়া।
১৫
সর্বসিদ্ধির দাত্রী, নিত্যা, অনিত্য গুণ হইতে মুক্তা; সগুণা ও নির্গুণা, ধ্যানের যোগ্যা, অর্চিতা, সর্বসিদ্ধিদা।
১৬
দিব্যা, সিদ্ধিদাত্রী, বিদ্যা, মহাবিদ্যা, মহেশ্বরী; মহেশে পরম ভক্তিমতী মাহেশী, মহাকাল যাঁহার পূজা করেন। শুম্ভাসুরবিমর্দিনী জগদ্ধাত্রীকে প্রণাম করি।
১৭
রক্তপ্রিয়া, রক্তবর্ণা, রক্তবীজের বিনাশিনী; ভৈরবী, ভুবনা দেবী, লোলজিহ্বা, সুরেশ্বরী।
১৮
কখনও চতুর্ভুজা, কখনও দশভুজা, কখনও অষ্টাদশভুজা — শুভা; ত্রিপুরেশী, বিশ্বনাথের প্রিয়া, বিশ্বেশ্বরী, শিবা।
১৯
অট্টহাস্যময়ী ও অট্টহাস্যপ্রিয়া, ধূম্রাসুরের বিনাশিনী; কমলা, ছিন্নমস্তা, মাতঙ্গী, সুরসুন্দরী।
২০
ষোড়শী, বিজয়া, ভীমা, ধূম্রা ও বগলামুখী; সর্বসিদ্ধিদায়িনী, সমস্ত বিদ্যা ও মন্ত্রের বিশোধিনী। মন্ত্রসিদ্ধির নিমিত্ত সেই সারভূতা জগত্তারাকে প্রণাম করি।
ফলশ্রুতি
২১
হে বরারোহে, এই স্তব পরম সিদ্ধিদায়ক। হে গিরিনন্দিনি, ইহা পাঠ করিলে সত্যই মোক্ষ লাভ হয়।
২২
মঙ্গলবারের চতুর্দশীতে, বৃহস্পতিবারের অমাবস্যায়, আর শুক্রবার রাত্রিকালে এই স্তব পাঠ করিলে মোক্ষ লাভ হয়। হে শঙ্করি, তিন পক্ষ পাঠ করিলে মন্ত্রসিদ্ধি হয়।
২৩
চতুর্দশীর রাত্রে, আর শনি ও মঙ্গলবারের সন্ধ্যায় এই স্তব পাঠ করিলে মন্ত্রসিদ্ধি হয়।
২৪
কেবল এই স্তোত্র পাঠেই অনুত্তমা মন্ত্রসিদ্ধি হয়। ইহার ফলে ভুজঙ্গিনী চণ্ডী (কুলকুণ্ডলিনী শক্তি) সতত জাগ্রত থাকেন।
মহাবিদ্যা কবচ
মহাবিদ্যা কবচ — সম্পূর্ণ পাঠ
১
শুন দেবি, আদ্যা মহাবিদ্যার কবচ বলিতেছি — সর্বসিদ্ধিদায়ক, সমস্ত অভীষ্ট ফলের দাতা।
২
এই কবচের ঋষি সদাশিব, ছন্দ অনুষ্টুপ্, দেবতা মহাবিদ্যা; ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ — এই চারি ফল সাধনেই ইহার বিনিয়োগ।
৩
ঐং বীজ আমার মস্তক রক্ষা করুন, ক্লীং বীজ হৃদয়; শ্রীং বীজ সর্বদা নাভি, গুহ্য ও দুই চরণ রক্ষা করুন।
৪
সুন্দরী ললাট রক্ষা করুন, উগ্রা কণ্ঠদেশ; ভগমালা সমস্ত শরীর, আর চৈতন্যরূপিণী লিঙ্গস্থান রক্ষা করুন।
৫
বারাহী পূর্বদিকে রক্ষা করুন, ব্রহ্মাণী দক্ষিণে; বৈষ্ণবী উত্তরে, আর ইন্দ্রাণী পশ্চিমে রক্ষা করুন।
৬
মাহেশ্বরী অগ্নিকোণে, কমলা নৈর্ঋতকোণে; কৌমারী বায়ুকোণে, আর চামুণ্ডা ঈশানকোণে সর্বদা রক্ষা করুন।
ফলশ্রুতি
৭
এই কবচ না জানিয়া যে সাধক মহাবিদ্যার মন্ত্র জপ করেন, শত কোটি কল্পেও তাঁহার ফল লাভ হয় না।