দুর্গা
মহাশক্তি · মহিষাসুরমর্দিনী · উমা · পার্বতী · চণ্ডী
পরিচয়
‘দুর্গা’ শব্দের অর্থ — যিনি দুর্গতি নাশ করেন, আবার যাঁহার নিকট সহজে পৌঁছানো যায় না (দুর্গম)। দশমহাবিদ্যার তালিকায় তাঁহার নাম নাই, কিন্তু সমুদয় মহাবিদ্যার মূল মহাশক্তি তিনিই — চণ্ডী বলিতেছে, কালী তাঁহারই ভ্রুকুটি হইতে জন্মেন।
মহিষাসুরমর্দিনী রূপ — দশ হস্ত, সিংহবাহিনী, ত্রিনয়না। দশ হস্তে ত্রিশূল, চক্র, শঙ্খ, ধনু, বাণ, খড়্গ, চর্ম, গদা, বজ্র ও পদ্ম — দশ দিকেরই রক্ষা।
বাঙ্গালায় তিনি একাকিনী আসেন না — সঙ্গে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ। এইখানেই বাঙ্গালার নিজস্বতা: দুর্গা এখানে যুদ্ধদেবী যত, তদপেক্ষা অধিক পিত্রালয়ে আগতা কন্যা।
উৎপত্তির কাহিনী
মহিষাসুর ব্রহ্মার নিকট এই বর পাইয়াছিল — কোনও পুরুষ তাহাকে বধ করিতে পারিবে না। সেই বরের বলে সে স্বর্গ অধিকার করিল, দেবতারা রাজ্যচ্যুত হইলেন।
দেবতারা ব্রহ্মা-বিষ্ণু-শিবের নিকট গমন করিলেন। তাঁহাদের ক্রোধ হইতে নির্গত হইল প্রচণ্ড তেজ; সমস্ত দেবতার তেজ মিলিয়া রচিত হইল এক নারীমূর্তি। শিবের তেজে বদন, যমের তেজে কেশ, বিষ্ণুর তেজে বাহু, চন্দ্রের তেজে স্তন, ইন্দ্রের তেজে কটি — এইরূপে দেবী গড়িয়া উঠিলেন।
প্রত্যেক দেবতা আপন অস্ত্রের প্রতিরূপ দিলেন। হিমালয় দিলেন সিংহ। প্রচলিত বিশ্বাসে নয় দিন যুদ্ধের পর দশমীর দিনে দেবী মহিষাসুরকে বধ করিলেন — সেই হেতু বিজয়া দশমী।
বাঙ্গালার অকালবোধন — রামচন্দ্র শরৎকালে, অসময়ে, রাবণবধের পূর্বে দেবীর পূজা করেন। পূজার বিধান ছিল একশত আটটি নীলপদ্ম; কৃত্তিবাসের বর্ণনায় রামের ভক্তি পরীক্ষা করিতে দেবী স্বয়ং একটি পদ্ম লুকাইয়া রাখেন। একটি ন্যূন পড়ায় রাম আপন নয়ন উৎপাটন করিতে উদ্যত হইলে দেবী আবির্ভূতা হন। শরৎকালের দুর্গাপূজা তাই ‘অকালবোধন’।
মন্ত্র
একাক্ষর (বীজমন্ত্র)
দুর্গাবীজ।
প্রচলিত জপমন্ত্র
প্রচলিত জপমন্ত্র।
নবার্ণ মন্ত্র (নয় অক্ষর)
চণ্ডীপাঠের প্রধান মন্ত্র। ঐং = মহাসরস্বতী, হ্রীং = মহালক্ষ্মী, ক্লীং = মহাকালী।
নাম মন্ত্র
গৃহস্থের নিত্য জপ।
ধ্যানমন্ত্র
বঙ্গানুবাদ
- মস্তকে জটাজূট, তাহাতে অর্ধচন্দ্রের শোভা।
- তিনি ত্রিনয়না, মুখমণ্ডল পদ্ম ও চন্দ্রের ন্যায়।
- অতসীপুষ্পের ন্যায় অঙ্গকান্তি; তিনি সুপ্রতিষ্ঠিতা, সুলোচনা।
- নবযৌবনসম্পন্না, সর্বাভরণে ভূষিতা।
- তাঁহার দন্ত সুচারু, বক্ষ উন্নত।
- ত্রিভঙ্গ ভঙ্গিতে দণ্ডায়মানা — সেই মহিষাসুরমর্দিনীকে ধ্যান করি।
প্রণাম মন্ত্র
বঙ্গানুবাদ
হে সর্বমঙ্গলের মঙ্গলস্বরূপা, হে কল্যাণময়ী, হে সর্বার্থসাধিকা; হে শরণ্যা, হে ত্রিনয়না গৌরী, হে নারায়ণী — তোমাকে প্রণাম।
গায়ত্রী
বঙ্গানুবাদ
কাত্যায়নীকে জানি, কন্যাকুমারীকে ধ্যান করি — সেই দুর্গা আমাদের প্রেরণা দিন।
স্তোত্র — চণ্ডী (দেবীমাহাত্ম্য) — অপরাজিতা ও শক্রাদি স্তুতি হইতে
বাংলা অর্থ
- যে দেবী সর্বভূতে শক্তিরূপে অবস্থান করিতেছেন — তাঁহাকে পুনঃপুনঃ প্রণাম।
- হে দুর্গা, বিপদে যে তোমাকে স্মরণ করে, তুমি তাহার সকল ভয় হরণ কর।
- আর সুস্থ অবস্থায় যে তোমাকে স্মরণ করে, তাহাকে তুমি পরম শুভবুদ্ধি দান কর।
- হে দারিদ্র্য, দুঃখ ও ভয়ের হারিণী, তুমি ছাড়া আর কে আছে,
- যাঁহার চিত্ত সকলের উপকারের জন্য সর্বদা আর্দ্র হইয়া থাকে?
শ্রীসিদ্ধকুঞ্জিকাস্তোত্রম্ — সম্পূর্ণ পাঠ
পাঠকের জন্য টীকা। ফলশ্রুতিতে মারণ, উচ্চাটন, স্তম্ভন প্রভৃতি অভিচার-কর্মের উল্লেখ আছে। এগুলি তন্ত্রের প্রাচীন শাস্ত্রীয় বর্ণনা; আজকের পূজা-পাঠে ইহাদের কোনও স্থান নাই, আর কাহারও ক্ষতি কামনা করা ভক্তির পথ নহে। পাঠটি এখানে শাস্ত্রের নথি হিসাবে অবিকল দেওয়া হইল।
এই পাঠের বঙ্গানুবাদ এখনও লেখা হয় নাই; কেবল মূল সংস্কৃত দেওয়া হইল।
১
২
৩
৪
৫
৬
৭
৮
৯
১০
১১
১২
১৩
১৪
১৫
প্রধান মন্দির
বাংলার বনেদি বাড়ির দুর্গাদালান
পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে — শোভাবাজার রাজবাড়ি, কলকাতা
বাংলায় দুর্গার স্থায়ী মন্দিরের চেয়ে বারোয়ারি ও বাড়ির পূজার ধারা প্রবল। ১৭৫৭ সাল থেকে শোভাবাজার রাজবাড়ির পূজা কলকাতার প্রাচীনতমগুলির একটি।
বিমলা মন্দির, পুরী ও কনক দুর্গা মন্দির, বিজয়ওয়াড়া — পুরীর জগন্নাথ মন্দির চত্বরে বিমলা শক্তিপীঠ; দক্ষিণে কনক দুর্গা প্রধান দুর্গাপীঠ।
মন্দির
বিগ্রহ

ছবি: Deepak Kumar Singh · CC BY-SA 4.0 · কমন্স

ছবি: Joydeep · CC BY-SA 3.0 · কমন্স
কাহিনী
অকালবোধন
দেবীর পূজার শাস্ত্রসম্মত সময় বসন্তকাল — বাসন্তী পূজা, পুরাণমতে যা রাজা সুরথ প্রথম করেছিলেন। লঙ্কা আক্রমণের আগে রামচন্দ্র বুঝলেন, দেবীর কৃপা ছাড়া জয় নেই। কিন্তু তখন শরৎকাল, দেবতাদের রাত্রি — পূজার সময় নয়। ব্রহ্মার পরামর্শে রাম অসময়েই দেবীকে জাগালেন, তাই ‘অকালবোধন’। একশো আটটি নীলপদ্ম জোগাড় হল, কিন্তু অঞ্জলি দিতে গিয়ে দেখা গেল একটি কম। রাম নিজের চোখকে ‘নীলপদ্ম’ বলে উপড়ে নিতে উদ্যত হলেন — তখনই দেবী হাত ধরে ফেললেন। বাংলার শরৎকালের পূজা সেই ঘটনারই উত্তরাধিকার।
আগমনী — মেয়ে ঘরে ফিরছে
বাংলার আগমনী গানে দুর্গা দেবী নন, মেয়ে। মেনকা স্বপ্ন দেখেন, উমা কাঁদছে — শ্বশুরবাড়িতে খেতে পায় না; স্বামীর পরনে বাঘছাল, তিনি নেশাভাঙ করেন। মেনকা গিরিরাজকে ধরেন, ‘মেয়েকে এনে দাও।’ সপ্তমীতে মেয়ে আসে, দশমীতে ফিরে যায় — আর মা দাঁড়িয়ে দেখেন। বাঙালির দশমী তাই বিজয়ের দিন কম, বিদায়ের দিন বেশি।
বই
- শ্রীশ্রীচণ্ডী
লেখক / সংকলক: স্বামী জগদীশ্বরানন্দ (অনুবাদ ও টীকা)
প্রকাশক: উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা
সাতশো শ্লোক, তিন চরিত — দুর্গার মূল গ্রন্থ। - দুর্গাসপ্তশতী
লেখক / সংকলক: মার্কণ্ডেয় ঋষি (মার্কণ্ডেয় পুরাণের অংশ)
প্রকাশক: গীতা প্রেস, গোরখপুর
চণ্ডীরই পাঠ — সংস্কৃত মূল ও হিন্দি অনুবাদ, কবচ-অর্গলা-কীলক ও রহস্যত্রয়সহ। - শ্রীমদ্দেবীভাগবত পুরাণ
লেখক / সংকলক: কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস (বেদব্যাস)
প্রকাশক: গীতা প্রেস, গোরখপুর
দেবীকে পরব্রহ্ম বলে প্রতিষ্ঠা করা পুরাণ। - ভারতের শক্তি-সাধনা ও শাক্ত সাহিত্য
লেখক / সংকলক: শশিভূষণ দাশগুপ্ত
প্রকাশক: সাহিত্য সংসদ, কলকাতা
আগমনী-বিজয়ার পদ ও বাংলার দুর্গাপূজার ইতিহাস।
