শক্তি
দেবীর রূপ, মন্ত্র, কাহিনী ও সঙ্গীত

জগদ্ধাত্রী

মহাশক্তি · উমা হৈমবতী · জগন্মাতা

পরিচয়

‘জগদ্ধাত্রী’ অর্থে — যিনি জগৎকে ধারণ করেন। কার্তিক মাসের শুক্লা নবমীতে তাঁহার পূজা; চন্দননগর, কৃষ্ণনগর ও রিষড়ার জগদ্ধাত্রী পূজা বিখ্যাত।

দেহ উদীয়মান সূর্যের ন্যায় রক্তাভ, চারি হস্তে শঙ্খ, চক্র, ধনু ও বাণ। বাহন সিংহ, আর সিংহের অধোদেশে করীন্দ্রাসুর, যাহার মস্তক হস্তীর। দেহে নাগযজ্ঞোপবীত, অর্থাৎ সর্পের উপবীত।

হস্তীকে বলা হয় অহংকারের প্রতীক। দুর্গা যেমন মহিষাসুরকে বধ করেন, জগদ্ধাত্রী তেমনই করীন্দ্রাসুরকে দমন করেন — এই অসুর অহংকারেরই রূপ।

উৎপত্তির কাহিনী

কেনোপনিষদের কাহিনী। দেবাসুর যুদ্ধে দেবতারা জয়ী হইলেন, এবং জয়ী হইয়া অহংকার করিলেন — ‘আমরাই জিতিয়াছি।’ তখন তাঁহাদের সম্মুখে এক রহস্যময় যক্ষ আসিয়া দাঁড়াইলেন।

অগ্নিকে যক্ষ জিজ্ঞাসিলেন, ‘তুমি কী পার?’ অগ্নি বলিলেন, ‘সমস্ত দগ্ধ করিতে পারি।’ যক্ষ একটি তৃণখণ্ড রাখিয়া বলিলেন, ‘ইহা দগ্ধ কর।’ অগ্নি সমুদয় শক্তি প্রয়োগ করিয়াও তাহা দগ্ধ করিতে পারিলেন না। বায়ু আসিলেন — ‘সমস্ত উড়াইয়া দিতে পারি।’ তিনিও সেই তৃণ নড়াইতে পারিলেন না।

তখন ইন্দ্র অগ্রসর হইলেন, আর যক্ষ অন্তর্হিত হইলেন। সেই স্থানে দেখা দিলেন উমা হৈমবতী — স্বর্ণের ন্যায় উজ্জ্বলা এক দেবী। তিনি বলিলেন, ‘ঐ যক্ষই ব্রহ্ম। তোমরা যে জয় পাইয়াছ, তাহা ব্রহ্মেরই জয়।’

বাঙ্গালার জগদ্ধাত্রী এই উমা হৈমবতীরই রূপ। প্রচলিত কথা — নদিয়ার মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায় একবার দুর্গাপূজায় যোগ দিতে পারেন নাই, কারাগারে ছিলেন। মুক্তি পাইয়া দেবীর স্বপ্নাদেশে কার্তিকী নবমীতে জগদ্ধাত্রী পূজা আরম্ভ করেন; সেইখান হইতেই চন্দননগরে বিস্তার। (ইহা কিংবদন্তি; কৃষ্ণচন্দ্রের পূর্বেও নদিয়ায় জগদ্ধাত্রীর উপাসনা ছিল — কাহিনীর পাতায় বিস্তারিত।)

মন্ত্র

একাক্ষর (বীজমন্ত্র)

হ্রীং

মায়াবীজ; জগদ্ধাত্রীর পূজায় ইহাই মূল বীজ।

বীজসহ নাম মন্ত্র

ওঁ হ্রীং জগদ্ধাত্র্যৈ নমঃ

সংক্ষিপ্ত রূপ।

ত্রিবীজ মন্ত্র

ওঁ হ্রীং শ্রীং ক্লীং জগদ্ধাত্র্যৈ নমঃ

প্রচলিত জপমন্ত্র।

নাম মন্ত্র

ওঁ জগদ্ধাত্র্যৈ নমঃ

গৃহস্থের নিত্য জপ।

ধ্যানমন্ত্র

সিংহস্কন্ধসমারূঢ়াং নানালঙ্কারভূষিতাম্‌। চতুর্ভুজাং মহাদেবীং নাগযজ্ঞোপবীতিনীম্‌॥ শঙ্খং চক্রং ধনুর্বাণং ধারয়ন্তীং চ বিগ্রহাম্‌। বালার্কসদৃশীং দেবীং জগদ্ধাত্রীং নমাম্যহম্‌॥

বঙ্গানুবাদ

প্রণাম মন্ত্র

ওঁ জগদ্ধাত্রি নমস্তুভ্যং জগৎপালনকারিণি। করীন্দ্রাসুরহন্ত্রী চ ভক্তানাং ভয়নাশিনি॥

বঙ্গানুবাদ

হে জগদ্ধাত্রী, তোমাকে নমস্কার — তুমি জগতের পালনকারিণী। তুমি করীন্দ্রাসুরের হন্ত্রী, ভক্তদের ভয়নাশিনী।

গায়ত্রী

ওঁ জগদ্ধাত্র্যৈ বিদ্মহে ভবানীপ্রিয়ায়ৈ ধীমহি। তন্নো দেবী প্রচোদয়াৎ॥

বঙ্গানুবাদ

জগদ্ধাত্রীকে জানি, ভবানীপ্রিয়াকে ধ্যান করি — সেই দেবী আমাদের প্রেরণা দিন।

স্তোত্র — জগদ্ধাত্রী স্তুতি

জগদ্ধাত্রি নমো নিত্যং জগৎপালনতৎপরে। ত্বমেব জননী লোকে ত্বমেব পরমা গতিঃ॥ করীন্দ্রমর্দিনী দেবী সিংহপৃষ্ঠনিবাসিনী। অহংকারহরে মাতঃ ত্বাং নমামি জগন্ময়ি॥

বাংলা অর্থ

শ্রীজগদ্ধাত্রীস্তোত্রম্‌ — সম্পূর্ণ পাঠ

এই পাঠের বঙ্গানুবাদ এখনও লেখা হয় নাই; কেবল মূল সংস্কৃত দেওয়া হইল।

১

আধাররূপে চাধেয়ে ধৃতিরূপে ধুরন্ধরে । ধ্রুবে ধ্রুবপদে ধীরে জগদ্ধাত্রি নমোঽস্তু তে ॥ ১॥

২

শিবাকারে শক্তিরূপে শক্তিস্থে শক্তিবিগ্রহে । শক্তাচারপ্রিয়ে দেবি জগদ্ধাত্রি নমোঽস্তু তে ॥ ২॥

৩

জয়দে জগদানন্দে জগদেকপ্রপূজিতে । জয় সর্বগতে দুর্গে জগদ্ধাত্রি নমোঽস্তু তে ॥ ৩॥

৪

সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মরূপে চ প্রাণাপানাদিরূপিণি । ভাবাভাবস্বরূপে চ জগদ্ধাত্রি নমোঽস্তু তে ॥ ৪॥

৫

কালাধিরূপে কালেশে কালাকালবিভেদিনি । সর্বস্বরূপে সর্বজ্ঞে জগদ্ধাত্রি নমোঽস্তু তে ॥ ৫॥

৬

মহাবিঘ্নে মহোৎসাহে মহামায়ে বরপ্রদে । প্রপঞ্চসারে সাধ্বীশে জগদ্ধাত্রি নমোঽস্তু তে ॥ ৬॥

৭

আগম্যে জগতামাদ্যে মাহেশ্বরি বরাঙ্গনে । অশেষরূপে রূপস্থে জগদ্ধাত্রি নমোঽস্তু তে ॥ ৭॥

৮

তীর্থযজ্ঞতপোদানযোগসারে জগন্ময়ি । ত্বমেব সর্বং সর্বস্থে জগদ্ধাত্রি নমোঽস্তু তে ॥ ৮॥

৯

দয়ারূপে দয়াদৃষ্টে দয়ার্দ্রে দুঃখমোচনি । সর্বাপত্তারিকে দুর্গে জগদ্ধাত্রি নমোঽস্তু তে ॥ ৯॥

১০

আগম্যধাম-ধামস্থে মহাযোগীশ-হৃৎপুরে । অমেয়ভাবকূটস্থে জগদ্ধাত্রি নমোঽস্তু তে ॥ ১০॥

প্রধান মন্দির

চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পূজা
চন্দননগর, হুগলি, পশ্চিমবঙ্গ

স্থায়ী মন্দিরের চেয়ে এখানে পূজার ঐতিহ্যই প্রধান। চন্দননগরের আলোকসজ্জা ও শোভাযাত্রা বিশ্ববিখ্যাত; পূজা কার্তিকী শুক্লা নবমীতে।

কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির জগদ্ধাত্রী পূজা, নদিয়া — প্রচলিত বিশ্বাসে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের প্রবর্তিত; তবে তাঁর আগেও নদিয়ায় জগদ্ধাত্রীর উপাসনা ছিল (কাহিনীর পাতায় বিস্তারিত)।

জগদ্ধাত্রী পূজা — উইকিপিডিয়া

মন্দির

চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পূজা (২০২৪)
চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পূজা (২০২৪)
ছবি: Sourabh.biswas003 · CC BY-SA 4.0 · কমন্স
চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পূজা (২০২৪)
চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পূজা (২০২৪)
ছবি: Sourabh.biswas003 · CC BY-SA 4.0 · কমন্স

বিগ্রহ

জগদ্ধাত্রী প্রতিমা
জগদ্ধাত্রী প্রতিমা
ছবি: Arpansrkr · CC BY-SA 3.0 · কমন্স

কাহিনী

তৃণখণ্ড

যুদ্ধ জিতে দেবতারা উৎসব করছেন। অগ্নি বুক ফুলিয়ে বললেন, ‘আমি না থাকলে কী হত!’ বায়ু বললেন, ‘আমিই তো উড়িয়ে দিয়েছি ওদের।’ ঠিক তখন সামনে এসে দাঁড়ালেন এক অচেনা জ্যোতির্ময় যক্ষ। কেউ তাঁকে চিনতে পারল না। অগ্নিকে পাঠানো হল। যক্ষ সামনে একটা শুকনো ঘাস রেখে বললেন, ‘পোড়াও।’ ত্রিভুবন-দহনকারী অগ্নি সমস্ত শক্তি ঢেলেও একটি ঘাস পোড়াতে পারলেন না। বায়ু তাকে নড়াতে পারলেন না। ইন্দ্র এগোতেই যক্ষ অদৃশ্য, আর সেখানে দাঁড়িয়ে উমা হৈমবতী। তিনি বললেন — ‘শক্তি তোমাদের নয়। তোমরা বাহক মাত্র।’ জগদ্ধাত্রীর সিংহের নীচে যে হাতি, সে আর কেউ নয় — ওই ‘আমিই করেছি’ বোধটাই।

বই


এই রূপের প্রচলিত বাংলা গান বিশেষ নাই। সমস্ত গান →

সতর্কবার্তা। এই পৃষ্ঠার মন্ত্রসমূহ স্বেচ্ছায় জপ করিবার বস্তু নহে। দশমহাবিদ্যার তান্ত্রিক মন্ত্র — বিশেষতঃ বীজমন্ত্র, পঞ্চদশী, বগলামুখী, ছিন্নমস্তা, ধূমাবতী ও মাতঙ্গীর মন্ত্র — শাস্ত্রমতে দীক্ষা ব্যতীত জপের বিধান নাই। গুরুর নিকট দীক্ষা গ্রহণ করিয়া, তাঁহার আদেশে, তাঁহার তত্ত্বাবধানেই ইহা অনুষ্ঠেয়। গুরুর পথনির্দেশ ব্যতিরেকে কেহ স্বয়ং চেষ্টা করিবেন না। এখানে মন্ত্র উদ্ধৃত হইয়াছে পাঠ, পরিচয় ও অর্থবোধের নিমিত্ত — সাধনার নির্দেশিকারূপে নহে।

মন্ত্র, ধ্যান ও স্তোত্র নানা গ্রন্থে পাঠভেদে ভিন্ন হইয়া থাকে; অনুষ্ঠানে ব্যবহারের পূর্বে মুদ্রিত পুঁথি ও পঞ্জিকার সহিত মিলাইয়া লইবেন।

শক্তি — সমস্ত রূপের সূচি · স্বীকৃতি · গোপনীয়তার নীতি