কালী
প্রথম মহাবিদ্যা · দক্ষিণাকালী · শ্যামা · আদ্যাশক্তি
পরিচয়
দশমহাবিদ্যার প্রথমা কালী। নাম আসিয়াছে ‘কাল’ শব্দ হইতে — যিনি কালকেও গ্রাস করেন, তিনিই কালী। তন্ত্রে তিনি আদ্যাশক্তি, সমুদয় বিদ্যার মূল; অবশিষ্ট নয়টি মহাবিদ্যা তাঁহারই নানা প্রকাশ বলিয়া গণ্য।
দক্ষিণাকালীর রূপ — গাঢ় মেঘবর্ণ দেহ, মুক্তকেশ, ত্রিনয়ন, চতুর্ভুজা। বাম দুই হস্তে খড়্গ ও ছিন্নমুণ্ড, দক্ষিণ দুই হস্তে বর ও অভয়। কণ্ঠে পঞ্চাশটি নরমুণ্ডের মালা — সংস্কৃত বর্ণমালার পঞ্চাশ অক্ষর, অর্থাৎ সমুদয় শব্দ ও সমুদয় জ্ঞান। কটিদেশে নরহস্তের বসন — কর্মের বন্ধন। শিবের বক্ষোপরি তাঁহার দক্ষিণ চরণ।
জিহ্বা বাহিরে — ভক্তেরা বলেন, উহা লজ্জারই চিহ্ন; স্বামীর বক্ষে চরণ পড়িয়াছে বুঝিয়া মাতার লজ্জা। তান্ত্রিক ব্যাখ্যায় উহা রজোগুণকে সত্ত্বগুণ দ্বারা দমনের সংকেত।
উৎপত্তির কাহিনী
চণ্ডী অর্থাৎ দেবীমাহাত্ম্যের সপ্তম অধ্যায়ে কালীর আবির্ভাব। শুম্ভ-নিশুম্ভের সেনাপতি চণ্ড ও মুণ্ড যখন দেবী অম্বিকাকে আক্রমণ করিল, দেবীর ললাট ক্রোধে কৃষ্ণবর্ণ হইয়া উঠিল, আর সেই ভ্রুকুটি হইতে নির্গত হইলেন করালবদনা কালী। চণ্ড ও মুণ্ডকে বধ করিয়া তিনি তাহাদের মস্তক দেবীর সম্মুখে রাখিলেন — সেই হেতু নাম চামুণ্ডা।
অনন্তর রক্তবীজের যুদ্ধ। রক্তবীজের এক বিন্দু রুধির ভূমিতে পড়িলেই তাহার সদৃশ আর এক অসুর জন্মায়। কালী জিহ্বা বিস্তার করিয়া প্রত্যেক রক্তবিন্দু ভূমিস্পর্শের পূর্বেই পান করিলেন; রক্তশূন্য রক্তবীজকে তখন দেবী চণ্ডিকা বধ করিলেন। এইখান হইতেই তাঁহার রক্তপানের রূপ।
যুদ্ধান্তে কালীর নৃত্য আর থামে না — জগৎ ধ্বংস হইবার উপক্রম। দেবতাগণের অনুরোধে শিব রণভূমিতে শবের ন্যায় শয়ন করিলেন। মাতার চরণ তাঁহার বক্ষে পড়িবামাত্র নৃত্য থামিয়া গেল, লজ্জায় তিনি জিহ্বা দংশন করিলেন। এই মুহূর্তটিই দক্ষিণাকালীর প্রতিমা।
দক্ষযজ্ঞের কাহিনীটি অন্যরূপ। দক্ষ আপন যজ্ঞে সতী ও শিবকে নিমন্ত্রণ করিলেন না। সতী তবু পিতৃগৃহে যাইতে চাহিলেন, শিব নিষেধ করিলেন; তখন সতী দশ দিক জুড়িয়া দশ মহাবিদ্যারূপে প্রকট হইলেন। তাঁহাদের মধ্যে প্রথমা কালী শিবের সম্মুখে দাঁড়াইলেন। দশমহাবিদ্যার সম্মিলিত উৎপত্তিকথা বলিতে ইহাকেই বুঝায়।
মন্ত্র
মন্ত্রের নাম (একাক্ষর, ত্র্যক্ষর …) আসে তাহার অক্ষরসংখ্যা হইতে; শাস্ত্রে সেই গণনায় আদির প্রণব (ওঁ) ধরা হয় না। বন্ধনীতে প্রণবসহ সমস্ত অক্ষরের সংখ্যা দেওয়া হইল।
একাক্ষর — বীজমন্ত্র (ওঁ-সহ ২ অক্ষর)
ত্র্যক্ষর (ওঁ-সহ ৪ অক্ষর)
পঞ্চাক্ষর (ওঁ-সহ ৬ অক্ষর)
ষড়ক্ষর (ওঁ-সহ ৭ অক্ষর)
ষড়ক্ষর — দ্বিতীয় রূপ (ওঁ-সহ ৭ অক্ষর)
দ্বাবিংশাক্ষরী — দক্ষিণাকালীর পূর্ণ মন্ত্র (ওঁ-সহ ২৩ অক্ষর)
দ্বাবিংশাক্ষরী — পাঠান্তর (২২ অক্ষর)
ধ্যানমন্ত্র
বঙ্গানুবাদ
- করালবদনা, ঘোররূপা, মুক্তকেশী, চতুর্ভুজা, মুণ্ডমালায় বিভূষিতা — এমন দিব্য দক্ষিণাকালিকাকে ধ্যান করি।
- তাঁহার বাম দিকের নীচের হাতে সদ্যশ্ছিন্ন মস্তক, উপরের হাতে খড়্গ; ডান দিকের উপরের হাতে অভয়, নীচের হাতে বরমুদ্রা।
- তিনি মহামেঘের ন্যায় শ্যামবর্ণা, দিগম্বরী — আকাশই তাঁহার বস্ত্র।
- কণ্ঠের মুণ্ডমালা হইতে ঝরিয়া পড়া রক্তে তাঁহার দেহ চর্চিত।
- তিনি শ্মশানবাসিনী, শবরূপী মহাদেবের হৃদয়ের উপর অবস্থিতা; চারিদিকে শিবাগণ ঘোর রবে ডাকিতেছে।
প্রচলিত আর একটি পাঠ
শবের উপর আরূঢ়া, অতি ভয়ংকরী, ভয়াল দন্তযুক্তা অথচ হাস্যমুখী, চতুর্ভুজা — হস্তে খড়্গ ও ছিন্নমুণ্ড, বর ও অভয়; মুণ্ডমালাধারিণী, প্রসারিতজিহ্বা, দিগম্বরী, শ্মশানবাসিনী — এইরূপে কালীর ধ্যান করিবে।
শব্দে-শব্দে অর্থ
| শব্দ | অর্থ |
|---|---|
| ওঁ | প্রণব; পরমব্রহ্মের প্রতীক |
| শব | মৃতদেহ |
| আরূঢাম্ | আরোহণ করিয়াছেন, উপরে অবস্থান করিতেছেন |
| মহাভীমাম্ | অত্যন্ত ভয়ংকরী |
| ঘোরদংষ্ট্রাম্ | ভয়ংকর দন্তযুক্তা |
| হসন্মুখীম্ | হাস্যোজ্জ্বল মুখবিশিষ্টা |
| চতুর্ভুজাম্ | চারি বাহুবিশিষ্টা |
| খড্গ | তরবারি |
| মুণ্ড | ছিন্ন মস্তক |
| বর | বরদান |
| অভয় | ভয়হীনতা |
| করাম্ | যাঁহার হস্তে (কর = হস্ত) |
| শিবাম্ | মঙ্গলময়ী |
| মুণ্ডমালা | মস্তকের মালা |
| ধরাম্ | ধারণকারিণী |
| দেবীম্ | দেবীকে |
| ললজ্জিহ্বাম্ | বাহিরে প্রসারিত জিহ্বাযুক্তা |
| দিগম্বরাম্ | দিক্কেই বস্ত্ররূপে ধারণকারিণী; বস্ত্রহীনা |
| এবম্ | এইভাবে |
| সঞ্চিন্তয়েৎ | ধ্যান করিবে |
| কালীম্ | কালীকে |
| শ্মশানালয় | শ্মশানকেই আবাসরূপে যিনি গ্রহণ করিয়াছেন |
| বাসিনীম্ | যিনি বাস করেন |
প্রণাম মন্ত্র
বঙ্গানুবাদ
জয়ন্তী, মঙ্গলা, কালী, ভদ্রকালী, কপালিনী, দুর্গা, শিবা, ক্ষমা, ধাত্রী, স্বাহা ও স্বধা — এই সকল নামে পরিচিতা যে তুমি, তোমাকে প্রণাম।
গায়ত্রী
বঙ্গানুবাদ
কালিকাকে জানি, শ্মশানবাসিনীকে ধ্যান করি — সেই ঘোররূপা আমাদের প্রেরণা দিন।
স্তোত্র — কর্পূরাদি স্তোত্র — প্রথম শ্লোক
বাংলা অর্থ
- স্তোত্রটি মহাকালসংহিতার অংশ বলিয়া ধরা হয়; বাঙ্গালায় ইহা ‘কর্পূরাদি স্তোত্র’ নামে বহুল পঠিত। সম্পূর্ণ পাঠ নীচে।
- প্রথম শ্লোকে কবি সংকেতে কালীবীজ ‘ক্রীং’-এর গঠন বলিতেছেন — ‘কর্পূর’ শব্দ হইতে মধ্যম বর্ণ (প), অন্ত্য বর্ণ (র) ও স্বর (ঊ) বাদ দিলে থাকে ‘ক্র’; তাহাতে বামাক্ষি (ঈ) ও ইন্দু (অনুস্বার) যোগ করিলে হয় ‘ক্রীং’।
- অর্থ: হে মাতা, হে ত্রিপুরহরের বধূ, হে ঘনমেঘের ন্যায় কৃষ্ণকান্তি দেবী! যাঁহারা তোমার এই বীজ তিনবার জপ করেন, সিদ্ধিপ্রাপ্ত সেই সাধকদের মুখ হইতে গদ্য ও পদ্য স্বচ্ছন্দে নিঃসৃত হয়।
শ্রীদক্ষিণকালিকাস্তোত্রম্ — সম্পূর্ণ পাঠ
১
হে কৃশোদরী, হে মহাচণ্ডী, হে মুক্তকেশী, হে বলিপ্রিয়া! কুলাচারে প্রসন্নমুখী, শঙ্করের প্রিয়া — তোমাকে প্রণাম।
২
হে ভয়ংকর দন্তযুক্তা, হে কোটরসদৃশ নয়না, হে গীত ও শব্দে প্রকাশমানা! হে প্রচণ্ড গর্জনধ্বনিময়ী, হে চিত্তবাসিনী — তোমাকে প্রণাম।
৩
হে বন্ধূকপুষ্পের ন্যায় উজ্জ্বলবর্ণা, হে ত্রিপুরা, হে ভয়নাশিনী! হে সৌভাগ্যের উদয়স্বরূপা, হে বরবর্ণিনী — তোমাকে প্রণাম।
৪
জয় হউক, হে দেবী, হে জগদ্ধাত্রী! হে ত্রিপুরার আদ্যাশক্তি, হে ত্রিদেবতারূপিণী! হে ভক্তগণের বরদাত্রী, হে মহিষঘ্নী — তোমাকে প্রণাম।
৫
ঘোর বিঘ্নের বিনাশের নিমিত্ত ও কুলাচারের সমৃদ্ধির নিমিত্ত, হে বরদা দেবী, হে মুণ্ডমালাবিভূষিতা — আমি তোমাকে প্রণাম করি।
৬
হে রক্তধারায় সমাকীর্ণা, হে কলকাঞ্চীতে বিভূষিতা! হে সর্ববিঘ্নহরা কালী, হে ভৈরবপ্রিয়া — তোমাকে প্রণাম।
৭
হে দক্ষিণামূর্তি, হে কালী, হে ত্রিপুরভৈরবী — তোমাকে প্রণাম। ভিন্ন অঞ্জনরাশির ন্যায় গাঢ়বর্ণা, শবের উপর সুস্থিরা।
৮
কণ্ঠ হইতে ঝরিতেছে শোণিতধারা, অথচ মুখপদ্মে মৃদু হাস্য; পীন ও উন্নত যুগল কুচ — হে ঘোরা দক্ষিণাকালী, তোমাকে প্রণাম।
৯
আরক্ত ও শান্ত নয়নপংক্তিতে বিরাজমানা, দুই শবকে কর্ণভূষণরূপে ধারণকারিণী — হে মদবিহ্বলা, তোমাকে প্রণাম।
১০
পঞ্চাশটি মুণ্ডে গাঁথা মালায় রক্তবর্ণে রঞ্জিতা, নানা মণির শোভায় সমৃদ্ধা — হে ব্রহ্মসেবিতা, তোমাকে প্রণাম।
১১
শবাস্থিতে গড়া কেয়ূরধারিণী, শঙ্খকঙ্কণে মণ্ডিতা, শবের বক্ষে সমারূঢ়া — হে বিষ্ণুপূজিতা, তোমাকে প্রণাম।
১২
শবমাংস যাঁহার গ্রাস, যিনি পুনঃপুনঃ অট্টহাস্য করেন, অথচ মুখে দ্রুত উদ্ভাসিত হাস্যের আমোদ — হে শিববন্দিতা, তোমাকে প্রণাম।
১৩
বাম হস্তে খড়্গ ও মুণ্ডধারিণী, দক্ষিণ হস্তে অভয় ও বরপ্রদা, দন্তুরা ও মহারৌদ্রা — হে চণ্ডনায়িকা, তোমাকে প্রণাম।
১৪
হে দেবী, তুমিই পরমা গতি; হে পরমেশ্বরী, তুমিই মাতা। হে করুণায় আর্দ্রা, আমাকে রক্ষা কর — হে চণ্ডনায়িকা, তোমাকে প্রণাম।
১৫
হে কালিকা দেবী, তোমাকে প্রণাম; হে ভক্তবৎসলা, তোমাকে প্রণাম। হে দেবী, আমার মূর্খতা হরণ কর — হে প্রতিভা ও জয়ের দাত্রী।
১৬
গদ্যপদ্যময়ী বাণী, তর্ক, ব্যাকরণ প্রভৃতি — এবং যে বিদ্যা অধ্যয়ন না করিয়াও লভ্য, তাহাও আমাকে দাও, হে দক্ষিণকালিকা।
১৭
সভামধ্যে জয় দাও, ধনাগমে ধন দাও, আমাকে দীর্ঘায়ু দাও — হে দক্ষিণাকালিকা, রক্ষা কর।
১৮
রাজ্য দাও, যশ দাও, পুত্র, দারা ও ধন দাও; আর দেহান্তে আমাকে মুক্তি দাও — হে জগন্মাতা, আমার প্রতি প্রসন্না হও।
১৯
ওঁ — তুমিই মঙ্গলা, ভৈরবী, দুর্গা, কালিকা ও ত্রিদশেশ্বরী; তুমিই উমা, হৈমবতী, কন্যা, কল্যাণী ও ভৈরবেশ্বরী।
২০
তুমিই কালী, ব্রাহ্মী, মাহেশী, কৌমারী ও বৈষ্ণবী; তুমিই বারাহী, বাসবী ও চণ্ডী — মুনিগণ সর্বদা তোমাকেই এই নামে গাহিয়াছেন।
২১
উগ্রতারা, তারা, শিবা ও একজটা — এই নামেও তুমি অভিহিতা; লোকোত্তরা ও কালী নামেও কৃতীগণ তোমাকে সর্বদা গাহেন।
২২
যেমন কালী, তেমনই তারা; তেমনই ছিন্না ও কুল্লুকা। হে দেবী, তুমি এক মূর্তি — চারি ভেদে প্রকাশিতা; তুমিই সেই আদ্যা কালিকা।
২৩
এক, দুই, তিন — নানা ভেদে সেই দেবী কোটি কোটি অনন্তরূপিণী। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও নামভেদে তাঁহাকেই ‘কালিকা’ বলিয়া গাওয়া হয়।
২৪
পঞ্চমুখ শম্ভুও তোমার গুণ বলিয়া শেষ করিতে সমর্থ নহেন। চাপল্যবশে যে স্তোত্র রচিত হইল, তাহা ক্ষমা কর — বরদা হও।
২৫
প্রাণ রক্ষা কর, যশ রক্ষা কর, পুত্র, দারা ও ধন রক্ষা কর। সর্বকালে, সর্বদেশে আমাকে পালন কর, হে দক্ষিণকালিকা।
২৬
যে ব্যক্তি সম্যক্ পূজা করিয়া দিবসে অথবা রাত্রির সন্ধিক্ষণে এই স্তোত্র পাঠ করে, সে ধন, ধান্য ও পুত্র লাভ করে — ইহাতে সংশয় নাই।
এইরূপে দক্ষিণকালিকাস্তোত্র সম্পূর্ণ হইল।
কয়েকটি শব্দের অর্থ
| শব্দ | অর্থ |
|---|---|
| কৃশোদরী | কৃশ উদরবিশিষ্টা |
| মহাচণ্ডী | অত্যন্ত উগ্রা |
| মুক্তকেশী | খোলা কেশধারিণী |
| বলিপ্রিয়া | বলি-উপচারে প্রীতা |
| মুণ্ডমালা | মুণ্ডের মালা |
| দক্ষিণকালিকা | দক্ষিণাকালী |
| শবসংস্থিতা | শবের উপর অবস্থানকারিণী |
| খড্গ | খড়্গ; তরবারি |
| মুণ্ড | ছিন্ন মস্তক |
| অভয় | ভয়হীনতার বর |
| বর | অনুগ্রহ |
| ভক্তবৎসলা | ভক্তের প্রতি স্নেহশীলা |
| প্রতিভা | বুদ্ধির দীপ্তি |
| মুক্তি | মোক্ষ; বন্ধন হইতে মুক্তি |
| জগন্মাতা | জগতের মাতা |
শ্রীকর্পূরাদিস্তোত্রম্ — সম্পূর্ণ পাঠ
এই পাঠের বঙ্গানুবাদ এখনও লেখা হয় নাই; কেবল মূল সংস্কৃত দেওয়া হইল।
১
২
৩
৪
৫
৬
৭
৮
৯
১০
১১
১২
১৩
১৪
১৫
১৬
১৭
১৮
১৯
২০
২১
২২
শ্রীমদ্দক্ষিণকালিকাকবচম্ — সম্পূর্ণ পাঠ
১
ভৈরব কহিলেন — কালিকা নামে যে মহাবিদ্যা, তিনি ভুবনে দুর্লভ বলিয়া কথিত। তথাপি হে দেবী, হৃদয়ে একটি শল্য রহিয়া গিয়াছে; কৃপা করুন।
২
হে মহাদেবী, অনুকম্পা করিয়া কবচটি বলুন। হে মাতা, যদি না বলেন, তবে এই দেহ ত্যাগ করিব।
৩
শ্রীদেবী কহিলেন — বৎস, শঙ্কাও জন্মে; তথাপি তোমার প্রতি স্নেহে ইহা প্রকাশ করিলাম। ইহা অতিগুহ্যতর ও মহৎ — বলিবারও নহে, দেখাইবারও নহে।
৪
কালিকা জগতের মাতা, শোক ও দুঃখের বিনাশিনী; বিশেষত কলিযুগে তিনি মহাপাতকহারিণী।
৫
কালী আমার সম্মুখ রক্ষা করুন, কপালিনী পৃষ্ঠদেশ; কুল্লা দক্ষিণে, কুরুকুল্লা উত্তরে রক্ষা করুন।
৬
বিরোধিনী শির রক্ষা করুন, বিপ্রচিত্তা দুই চক্ষু; উগ্রা নাসিকা, আর উগ্রপ্রভা দুই কর্ণ রক্ষা করুন।
৭
দীপ্তা মুখ রক্ষা করুন, নীলা সর্বদা চিবুক; ঘনা সর্বদা গ্রীবা, বলাকা দুই বাহু রক্ষা করুন।
৮
মাত্রা দুই হস্ত রক্ষা করুন, মুদ্রা সর্বদা বক্ষ; মিতা দুই স্তন রক্ষা করুন, আর যোনিমণ্ডলদেবতা যোনিমণ্ডল।
৯
ব্রাহ্মী জঠর রক্ষা করুন, নারায়ণী নাভি; মাহেশ্বরী নিত্য ঊরু, চামুণ্ডা লিঙ্গ রক্ষা করুন।
১০
কৌমারী কটি ও দুই জানু রক্ষা করুন; অপরাজিতা দুই পদ, বারাহী অঙ্গুলিগুলি রক্ষা করুন।
১১
নারসিংহী সন্ধিস্থান রক্ষা করুন, পত্রস্থা দেবতাও রক্ষা করুন। যে স্থান রক্ষাহীন রহিয়া গেল, কবচে বাদ পড়িল —
১২
হে দেবী, হে ঘোরা দক্ষিণকালিকে, তাহা সমস্তই রক্ষা করুন। ঊর্ধ্বে, অধোদেশে ও সকল দিকে দেবী স্বয়ং এই দেহ রক্ষা করুন।
১৩
হিংস্র প্রাণী হইতে ও জলের বিপদ হইতে সাধককে সর্বদা রক্ষা করুন; দক্ষিণাকালিকা দেবী সর্বব্যাপকরূপে সদা রক্ষা করুন।
ফলশ্রুতি
১৪
এই কবচ না জানিয়া যে দক্ষিণাদেবীর জপ করে, সে পূজার ফল পায় না; পদে পদে তাহার বিঘ্ন ঘটে।
১৫
যে নিত্য এই কবচে আবৃত হইয়া যেখানেই যায়, সেখানেই তাহার অভয়; কোথাও তাহার ক্ষোভ থাকে না।
এইরূপে কালীকুলসর্বস্বে কালীকবচ অথবা শ্রীমদ্দক্ষিণকালিকাকবচ সমাপ্ত হইল।
কয়েকটি শব্দের অর্থ
| শব্দ | অর্থ |
|---|---|
| কবচ | অঙ্গরক্ষার মন্ত্র |
| শল্য | বিঁধিয়া থাকা কাঁটা, মনের খচখচানি |
| পুরতঃ | সম্মুখে |
| পৃষ্ঠতঃ | পিছনে |
| কুল্লা / কুরুকুল্লা | কুল্লা ও কুরুকুল্লা; কালীর দুই আবরণদেবতা |
| জঠর | উদর |
| সন্ধিস্থান | অস্থির জোড় |
| হিংস্র | হিংস্র জন্তু |
| ব্যপকত্ব | সর্বব্যাপী হইয়া থাকা |
শ্রীজগন্মঙ্গল কালীকবচম্ — সম্পূর্ণ পাঠ
ভৈরবী কহিলেন —
১
হে নাথ, হে প্রভো, কালীপূজা ও তাহার নানা ভাব শুনিয়াছি। এখন পূর্বে যে কবচের কথা বলিয়াছিলে, তাহা শুনিতে ইচ্ছা করি।
২
হে নাথ, তুমিই আশ্রয় — দুঃখ ও সংকট হইতে আমাকে রক্ষা কর। তুমিই স্রষ্টা, তুমিই পালক, তুমিই সংহর্তা।
৩
ভৈরব কহিলেন — হে ভৈরবি, হে প্রাণবল্লভে, রহস্য শুন, বলিতেছি। ‘শ্রীজগন্মঙ্গল’ নামে এই কবচ মন্ত্রেরই মূর্তি। ইহা পাঠ করিলে বা ধারণ করিলে ক্ষণমাত্রে ত্রিলোক মুগ্ধ হয়।
৪
ইহা ধারণ করিয়াই নারায়ণ নারীরূপ লইয়া যোগেশ্বর মহেশ্বরকে ক্ষুব্ধ করিয়াছিলেন; ইহা ধারণ করিয়াই রঘুকুলশ্রেষ্ঠ শ্রীরাম বরপ্রাপ্ত রাবণাদি নিশাচরদিগকে সংহার করিয়াছিলেন।
৫
হে প্রিয়ে, ইহারই প্রসাদে আমি ঈশ্বর ও ত্রৈলোক্যবিজয়ী প্রভু হইয়াছি; কুবের ধনাধিপ হইয়াছেন, শচীপতি ইন্দ্র সুরেশ্বর হইয়াছেন — এইভাবেই সমস্ত দেবতা সর্বসিদ্ধীশ্বর হইয়াছেন।
৬
এই শ্রীজগন্মঙ্গল কবচের ঋষি শিব, ছন্দ অনুষ্টুপ্, দেবতা দক্ষিণকালিকা।
৭
জগৎকে মোহিত করিতে, দুষ্টের নিগ্রহে, ভোগ ও মোক্ষে, এবং নারীর আকর্ষণে — ইহার বিনিয়োগ এইরূপে কথিত।
৮
পরা একাক্ষরী কালিকা আমার মস্তক রক্ষা করুন; খড়্গধারিণী কালিকা ললাট রক্ষা করুন।
৯
হুং হুং দুই নেত্র রক্ষা করুক, হ্রীং হ্রীং দুই কর্ণ; মহেশ্বরী দক্ষিণকালিকা নাসারন্ধ্রদ্বয় রক্ষা করুন।
১০
ক্রীং ক্রীং ক্রীং জিহ্বা রক্ষা করুক, হুং হুং দুই কপোল; হ্রীং হ্রীং স্বাহাস্বরূপিণী সমস্ত মুখ রক্ষা করুন।
১১
সুখদায়িনী দ্বাবিংশত্যক্ষরী মহাবিদ্যা দুই স্কন্ধ রক্ষা করুন; খড়্গ ও মুণ্ডধারিণী কালী চারিদিক হইতে সর্বাঙ্গ রক্ষা করুন।
১২
ত্র্যক্ষরী চামুণ্ডা আমার হৃদয় রক্ষা করুন; ‘হে হুং ওং ঐং’ দুই স্তন, আর হ্রীং ফট্ স্বাহা কাঁধ রক্ষা করুক।
১৩
কর্ত্রীসহিতা অষ্টাক্ষরী মহাবিদ্যা দুই ভুজ রক্ষা করুন; ষড়ক্ষরী বিদ্যা দুই হাত রক্ষা করুক।
১৪
ক্রীং নাভি রক্ষা করুক, দক্ষিণকালিকা মধ্যদেশ; দশাক্ষরী কালিকা ক্রীং স্বাহা রূপে পৃষ্ঠ রক্ষা করুন।
১৫
হ্রীং ক্রীং দক্ষিণে কালিকে হূং হ্রীং — দুই কটি রক্ষা করুক; দশাক্ষরী কালীবিদ্যা স্বাহা রূপে দুই ঊরু রক্ষা করুক; ওঁ হ্রাং ক্রীং মে স্বাহা রূপে কালিকা দুই জানু রক্ষা করুন।
১৬
এই বিদ্যা ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ — এই চতুর্বর্গের ফল দান করে।
১৭
ক্রীং হ্রীং হ্রীং গুল্ফ রক্ষা করুক, দক্ষিণকালিকা রক্ষা করুন; চতুর্দশাক্ষরী বিদ্যা ক্রীং হূং হ্রীং স্বাহা রূপে দুই পদ রক্ষা করুক।
১৮
খড়্গ ও মুণ্ডধারিণী, বরদা, ভয়হারিণী কালী সমস্ত বিদ্যার সহিত চারিদিক হইতে আমার সর্বাঙ্গ রক্ষা করুন।
১৯
কালী, কপালিনী, কুল্লা, কুরুকুল্লা, বিরোধিনী, বিপ্রচিত্তা, উগ্রা, উগ্রপ্রভা, দীপ্তা, ঘনত্বিষা —
২০
নীলা, ঘনা, বলাকা, মাত্রা, মুদ্রা ও মিতা — ইঁহারা সকলেই খড়্গধারিণী ও মুণ্ডমালায় বিভূষিতা; ইঁহারা আমাকে রক্ষা করুন।
২১
ব্রাহ্মী, নারায়ণী, মাহেশ্বরী, চামুণ্ডা, কৌমারী ও অপরাজিতা — এই দেবীগণ সকল দিকে আমাকে রক্ষা করুন।
২২
বারাহী ও নারসিংহী এবং অপরিমিত অলঙ্কারে ভূষিতা সকলে নিজ নিজ অস্ত্র লইয়া দিকে ও বিদিকে সর্বত্র আমাকে রক্ষা করুন।
ফলশ্রুতি
২৩
এইরূপে ‘শ্রীজগন্মঙ্গল’ নামে পরম অদ্ভুত দিব্য কবচ কথিত হইল — ইহা মহামন্ত্রসমূহেরই মূর্তি।
২৪
ত্রিলোক আকর্ষণকারী এই ব্রহ্মকবচ আমার মুখে উচ্চারিত হইল। গুরুপূজা করিয়া তবে ইহা গ্রহণ করিবে। একবার, তিনবার, অথবা যাবজ্জীবন ইহা পাঠ করিবে।
২৫
পঞ্চাশ বার আবৃত্তি করিলে ত্রৈলোক্যবিজয় হয়। এই কবচের প্রসাদে ত্রিলোক ক্ষুব্ধ হয়। এক মাসেই সাধক মহাকবি ও সর্বসিদ্ধীশ্বর হইয়া ওঠেন।
২৬
মূলমন্ত্রে কালিকাকে পুষ্পাঞ্জলি দিয়া একবার ইহা পাঠ করিলে শত সহস্র বর্ষের পূজার ফল লাভ হয়।
২৭
ভূর্জপত্রে লিখিয়া স্বর্ণে ভরিয়া যদি শিখায়, দক্ষিণ বাহুতে অথবা কণ্ঠে ধারণ করে —
২৮
তবে সে ত্রিলোক মোহিত করিতে পারে, ক্রোধে ক্ষণমাত্রে ত্রিলোক চূর্ণ করিতে পারে। নারী বহুসন্তানা ও জীববৎসা হয় — ইহাতে সন্দেহ নাই।
২৯
পরের শিষ্যকে, বিশেষত অভক্তকে ইহা দিবে না। কেবল ভক্তিযুক্ত নিজের শিষ্যকেই দিবে; অন্যথা মৃত্যু ঘটে।
৩০
এই কবচের প্রসাদে কমলা নিশ্চল হইয়া সাধকের গৃহে, আর বাগ্দেবী তাঁহার মুখে বাস করেন — পৌত্র পর্যন্ত স্থির হইয়া থাকেন।
৩১
এই কবচ না জানিয়া যিনি দক্ষিণকালীর মন্ত্র জপ করেন, শত লক্ষ জপেও তাঁহার বিদ্যা সিদ্ধ হয় না; তিনি শস্ত্রাঘাত পান, অচিরেই মৃত্যু ঘটে।
প্রধান মন্দির
দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ি
দক্ষিণেশ্বর, উত্তর ২৪ পরগনা, পশ্চিমবঙ্গ — গঙ্গার পূর্ব পাড়ে, বালি ব্রিজের কাছে
রানি রাসমণি ১৮৫৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন। বিগ্রহের নাম ভবতারিণী। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস এখানেই পূজারি ছিলেন এবং মায়ের দর্শন পান।
কালীঘাট মন্দির — কালীঘাট, কলকাতা — আদিগঙ্গার তীরে। একান্ন সতীপীঠের একটি; সতীর ডান পায়ের আঙুল এখানে পড়েছিল বলে বিশ্বাস।
দক্ষিণেশ্বর — উইকিপিডিয়া · কালীঘাট — উইকিপিডিয়া
মন্দির

ছবি: Nikkul (ইংরাজি উইকিপিডিয়া) · CC BY-SA 2.0 · কমন্স

ছবি: Alan Perry · CC BY 3.0 · কমন্স
বিগ্রহ

ছবি: কমন্স ব্যবহারকারী ‘Jagadhatri’ · CC BY-SA 3.0 · কমন্স
কাহিনী
রক্তবীজ বধ
রক্তবীজের বর ছিল — তার শরীরের এক ফোঁটা রক্ত মাটিতে পড়লেই সেই রক্ত থেকে আর একটি রক্তবীজ জন্মাবে। যুদ্ধে দেবীর অস্ত্রে যত আঘাত, তত নতুন অসুর। রণভূমি ভরে গেল অসংখ্য রক্তবীজে। তখন অম্বিকা কালীকে বললেন — ‘তুমি মুখ বাড়িয়ে রক্ত পান করো, আমি অস্ত্র চালাই।’ কালী জিহ্বা বিস্তার করলেন আকাশজুড়ে; প্রতিটি রক্তবিন্দু মাটি ছোঁয়ার আগেই তাঁর মুখে পড়ল। রক্তশূন্য রক্তবীজ শেষে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। সাধকেরা বলেন — আসক্তির বীজও ঠিক এমনই; মাটিতে পড়ার আগেই তাকে ধরতে হয়।
রামকৃষ্ণ ও খড়্গ
দক্ষিণেশ্বরে দিনের পর দিন ডেকেও মায়ের দর্শন পাননি রামকৃষ্ণ। একদিন অসহ্য হয়ে মন্দিরের দেওয়ালে টাঙানো খড়্গ নামাতে গেলেন — মা যদি ধরা না দেন, এ জীবন রেখে লাভ নেই। সেই মুহূর্তে, তাঁর নিজের বর্ণনায়, ঘর, দরজা, মন্দির সব মুছে গিয়ে অখণ্ড চেতনার সমুদ্র উঠে এল, আর তার ঢেউয়ের ভিতর থেকে মা এসে দাঁড়ালেন। জ্ঞান হারালেন তিনি। এরপর থেকে মা তাঁর কাছে মূর্তি নন, ঘরের লোক।
বই
- শ্রীশ্রীচণ্ডী
লেখক / সংকলক: স্বামী জগদীশ্বরানন্দ (অনুবাদ ও টীকা)
প্রকাশক: উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা
মার্কণ্ডেয় পুরাণের দেবীমাহাত্ম্য, বাংলা অনুবাদ ও ব্যাখ্যাসহ। সপ্তম-অষ্টম অধ্যায়ে কালীর আবির্ভাব ও রক্তবীজ বধ। - শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত
লেখক / সংকলক: শ্রীম (মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত)
প্রকাশক: কথামৃত ভবন, কলকাতা
পাঁচ খণ্ডে রামকৃষ্ণের শেষ চার বছরের (১৮৮২–১৮৮৬) কথোপকথনের দিনলিপি; তাঁর কালীভক্তির প্রত্যক্ষ বিবরণ। - ভারতের শক্তি-সাধনা ও শাক্ত সাহিত্য
লেখক / সংকলক: শশিভূষণ দাশগুপ্ত
প্রকাশক: সাহিত্য সংসদ, কলকাতা
বাংলা শাক্তপদাবলী ও কালীপূজার ইতিহাস নিয়ে প্রামাণ্য গবেষণাগ্রন্থ।